সব কাজে টাকা চান তিনি

একাধিক সেবাপ্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষ চাওয়ার ভিডিও ভাইরাল। নির্বাচন কর্মকর্তাসহ তিনজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ।

■ গত ২৪ মার্চ রাতে একটি ফেসবুক পেজে প্রথম ভিডিওটি আপলোড হয়। ফুটেজটি অসংখ্য মানুষের ফেসবুক আইডির মাধ্যমে ঘুরছে।

■ বেশ কয়েকটি ঘটনার ভিডিও একসঙ্গে করে এই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

কথা ছিল, সেবা নেওয়া ব্যক্তি বাসায় ফিরে গিয়ে অফিস সহকারীর বিকাশ নম্বরে ঘুষের টাকা পাঠিয়ে দেবেন। টাকা পাঠাতে যেন দেরি না হয়, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ব্যক্তিটিকে কার্যালয় ছাড়ার অনুমতি দেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। এরপর এক দিন যায়, দুদিন যায়; কিন্তু টাকা আসে না।

একদিন সেবা নিতে আসা কয়কেজন ব্যক্তির কাছে ‘দুঃখ করে’ সেই গল্প শোনাতে গিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এক শা...পুত ভোটার হয়ে গেছে, একটা টাকাও দেয় নাই। বলছে বিকাশ নম্বরে পাঠাবে। পাঠায় নাই। এখন আমরা কি তারে বেঁধে রাখতে পারি? ’

নিজ কার্যালয়ে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার ঘুষ লেনদেনের এমন ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ মার্চ রাতে একটি ফেসবুক পেজে প্রথম ভিডিওটি আপলোড হয়। এরপর থেকে ফুটেজটি অসংখ্য মানুষের ফেসবুক আইডির মাধ্যমে ঘুরছে। বেশ কয়েকটি ঘটনার ভিডিও একসঙ্গে করে এই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গতকাল রোববার উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক টুম্পা রানী সাহা ও অফিস সহায়ক নবী নোয়াজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশ্রাফুল আলম।

আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আশ্রাফুল আলম বলেন, ‘খুবই দুঃখজনক। অফিসে এসে লোকজন এতটা হয়রানি হতে পারে, ধারণায় ছিল না। বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এগোচ্ছি।’

আমি একজন জনপ্রতিনিধি। রাজনীতি করি। তিনি আমাকে সেদিন স্পষ্ট জানিয়ে দেন দুই হাজারের এক টাকা কম হলেও তাঁর পক্ষে কাজটি করে দেওয়া সম্ভব নয়।
নাছিমা আক্তার, জেলা পরিষদের সদস্য

ভিডিওর আরেক অংশে দেখা যায়, এক ব্যক্তি অফিসে আসেন জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে। এর আগে এসে তিনি ৩০০ টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার এসে কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে ফের টাকা চান নির্বাচন কর্মকর্তা। আগের টাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিতেই খেপে যান তিনি। তখন বলে ওঠেন, ‘চা খাওয়ার জন্য ৩০০ টাকা দিছেন, এতে যদি মনে করেন দেশ স্বাধীন করে ফেলেছেন, তবে টাকা নিয়ে যান। আপনি চায়না আপাকে ফোন দিতে পারেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চায়নার পুরো নাম হলো নাছিমা আক্তার চায়না। তিনি জেলা পরিষদের সদস্য। সম্পর্কে ভুক্তভোগীর ভাবি। উপায় না পেয়ে ওই ব্যক্তি নাছিমা আক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন। নাছিমা কথা বলেন নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে। ফুটেজে দেখা যায়, দুজনই টাকা নিয়ে দর–কষাকষি করছিলেন। কথা শেষে এক হাজার টাকা দিয়ে ভুক্তভোগী কার্যালয় ছাড়েন।

নাছিমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি একজন জনপ্রতিনিধি। রাজনীতি করি। ভুক্তভোগী আমার ঘরের মানুষ। এত করে অনুরোধ করলাম টাকা ছাড়া কাজটি করে দিতে। তিনি আমাকে সেদিন স্পষ্ট জানিয়ে দেন দুই হাজারের এক টাকা কম হলেও তাঁর পক্ষে কাজটি করে দেওয়া সম্ভব নয়।’

অন্য আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, ‘এক ব্যক্তিকে নির্বাচন কর্মকর্তা বলছেন আপনার কাজ পুরো মাগনা (বিনা মূল্যে) করে দিছি। এখন ৩০০ টাকা আপনাকে দিতে হবে। কাজ হতে সময় লাগবে তিন মাস।’ তখন ব্যক্তিটির উত্তর ছিল, ‘কম্পিউটারের দোকানে আবেদন করছি সেখানেও ৮০০ টাকা নিছে।’ এই কথা শুনে মেজাজ চড়িয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা বললেন, ‘কেউ কি আপনার বাপ-ভাই লাগে যে কাজ মাগনা (ফ্রি) করে দেবে?’

ফুটেজের আরেক অংশে দেখা যায়, নতুন ভোটকেন্দ্র করা নিয়ে নির্বাচন কর্মকর্তার কথোপকথন। সেখানে তিনি কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশীকে বলছেন, ‘একটা সেন্টার (ভোটকেন্দ্র) করে দিলে মানুষ লাখ লাখ টাকা দেয়। জেলা নির্বাচন অফিসার বারবার বলছে, অতিরিক্ত সেন্টার করা ঠিক হবে না, তারপরও আমি করে দিছি। বরং না করলে আমি ২০–৫০ হাজার টাকা পাইতাম।’ এ সময় পাশে বসে থাকা এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা তো সম্মান করছি এটার জন্য।’ এ কথা শুনে নির্বাচন কর্মকর্তা অফিস সহায়ক নবী নোয়াজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আচ্ছা নবী নোয়াজ, আমরা যদি এই সেন্টারটি নরসিংদী শহরে করে দিতাম, তবে তিন–চার লাখ টাকা পকেটে ঢুকিয়ে দিত না?’ নবী নোয়াজ সুর মিলিয়ে বলেন, ‘হায় সর্বনাশ, নরসিংদী! ওখানে তো শুধু টাকা আর টাকা।’

ভুক্তভোগীরা বলছেন, নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিনা পয়সায় কাজ সেরে এসেছেন, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। অনলাইন এনআইডি তালিকার জন্য সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে এক হাজার টাকা। ভোটার স্থানান্তরে সরকারি ফি না থাকলেও নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা করে। এনআইডি কার্ড সংশোধনের জন্য দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। নির্বাচনের সময় প্রতিটি মনোনয়ন ফরমের বিপরীতে পাঁচ হাজার টাকা করে নেওয়া নিয়মে পরিণত হয়েছে এই অফিসে।

বারবার চেষ্টা করেও ফোন না ধরায় নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। নির্বাচন কর্মকর্তার অফিস সূত্র জানায়, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নির্বাচন কর্মকর্তা বেশির ভাগ মানুষের ফোন এড়িয়ে চলছেন।