সাগরে ইলিশের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর ফিসারীঘাটে ইলিশের বেচাবিক্রি। বুধবার দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

বঙ্গোপসাগরের ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গভীরে জাল ফেলেও ইলিশের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ, সোনাদিয়া উপকূলেও ইলিশ নেই। ভরা মৌসুমে এমন পরিস্থিতি গত ১০ বছরে দেখা দেয়নি।

গতকাল বুধবার দুপুরে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা ফিশারিঘাটে এসব কথা বলেন ‘এফবি সাগর’ ট্রলারের জেলে আবুল কাশেম। মহেশখালীর কালারমারছড়া এলাকার এই জেলে সাগরে ইলিশ ধরছেন ১৭ বছর ধরে। সাগরের পানি দেখলে তিনি বুঝতে পারেন, ইলিশ আছে কি নেই। গত আগস্ট মাসে সেন্ট মার্টিন উপকূল থেকে আবুল কাশেমের ট্রলার ইলিশ ধরেছে অন্তত ৭০ লাখ টাকার।

এখন সাগরে ইলিশ নেই জানিয়ে আবুল কাশেম ( ৫১) বলেন, গত ৫ অক্টোবর থেকে টানা ২২ দিন সাগরে ইলিশ আহরণ বন্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে ২৬ অক্টোবর তাঁরা ট্রলার নিয়ে ২২ জন জেলে সাগরে ইলিশ ধরতে যান। টানা ৮ দিন সাগরের ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গভীরে জাল ফেলেও ইলিশের দেখা পাননি তাঁরা। গতকাল সকালে ১২টি ইলিশসহ অন্যান্য প্রজাতির আড়াই মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ নিয়ে ঘাটে ফেরে আবুল কাশেমের ট্রলারটি।

‘এফবি কুমকুম’ নামের আরেকটি ট্রলারের জেলে সাইফুল ইসলাম বলেন, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে শুধু সেন্ট মার্টিন উপকূল থেকে জেলেরা কয়েক হাজার মেট্রিক টন ইলিশ ধরেছিলেন। তখন দেশের কোথাও ইলিশ ধরা পড়েনি। এরপর ইলিশ উধাও হয়ে গেছে। ২২ দিন ইলিশ আহরণ বন্ধের সময় গভীর সাগর থেকে মা ইলিশ ডিম ছাড়তে উপকূলে আসে এবং ডিম ছেড়ে গভীর সাগরে ফিরে গেছে। কিন্তু গত সাত-আট দিন গভীর সাগরে জাল ফেলেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। ইলিশের বদলে জালে ধরা পড়ছে পোপা, লাক্ষ্যা, কোরাল, মাইট্যা, গুইজ্যা, কামিলা, চাপাসহ নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ।

গভীর সাগর থেকে আজ বেলা একটা পর্যন্ত বাঁকখালী নদীর ফিশারিঘাটে ভিড়েছে অন্তত ৬০-৭০টি ট্রলার। ট্রলারে হাতেগোনা কয়েকটি ইলিশ ধরা পড়েছে। এগুলোর আকারও বড়। ওজন ৯০০ গ্রাম থেকে ১ হাজার ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত। কিন্তু ট্রলারগুলোর জালে অন্যান্য প্রজাতির কিছু সামুদ্রিক মাছও ধরা পড়েছে। এসব মাছ স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে।

কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ২৬ অক্টোবর থেকে সাগরে ইলিশ ধরতে নামেন ছোট–বড় ছয় হাজার ট্রলারের অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার জেলে। কিন্তু সব কটি ট্রলার ফিরে আসছে ইলিশ ছাড়াই। গত বছর এ সময় প্রতিটা ট্রলারের জালে ৫০০ থেকে ৪ হাজার ইলিশ ধরা পড়েছিল। এখন ধরা পড়ছে ১০ থেকে ৫০টি ইলিশ। তবে কমবেশি সব ট্রলারে অন্যান্য প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে, যা বিক্রি করে জেলে ও ট্রলারমালিকেরা কিছুটা হলেও বাঁচার সুযোগ পাচ্ছেন।

ট্রলারমালিক ও মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত টানা ৬৫ দিন সাগরে ইলিশ আহরণ বন্ধ ছিল। এ কারণে ইলিশের প্রজনন ও আকৃতি বেড়েছে কয়েক গুণ। গত ৫ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন মা ইলিশ ডিম পারতে আসে উপকূলে। এ সময় সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রাখে সরকার। জেলেদের ধারণা ছিল, এরপর সাগরে বিপুল ইলিশ ধরা পড়বে, কিন্তু ইলিশের নাগাল না পাওয়ায় হতাশ সবাই।

‘এফবি মায়ের দোয়া’ ট্রলারের জেলে সলিম উল্লাহ বলেন, জেলেরা সাগরের পানি দেখলে বুঝতে পারেন, ইলিশ আছে কি নেই। ইলিশ যেখানে থাকবে, সেখানকার পানি লালচে থাকে। ইলিশ ঝাঁক বেঁধে চলাচলের সময় মাঝেমধ্যে পানির ওপরে মাথা তুলে দেয়, তখন সাগরের পানি লালচে দেখায়। কিন্তু গত সাত-আট দিন সাগরের বিশাল এলাকায় কয়েক হাজার ট্রলার তন্নতন্ন করেও কোথাও ইলিশের সন্ধান পায়নি। দেশের অন্যান্য উপকূলেও তেমন ইলিশ ধরা পড়ছে না।

জেলার অধিকাংশ ট্রলারের মাছ বিক্রি হয় নুনিয়াছটা ফিশারিঘাটের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। কেন্দ্রটি বাঁকখালী নদীর তীরে। এখান থেকেই ব্যবসায়ীরা ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ কিনে ট্রাক বোঝাই করে সরবরাহ করেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, বগুড়া, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ৮০ শতাংশ মাছ সরবরাহ হয় কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির মাধ্যমে। এ সমিতির সদস্যসংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। গতকাল বেলা একটা পর্যন্ত সমিতির ২০-২৫ জন সদস্য মিলে ৩০টার বেশি ট্রলার থেকে তিন মণ ইলিশ সংগ্রহ করেছেন। অন্যান্য প্রজাতির মাছ সংগ্রহ (কেনেন) করেন আরও ১২ মণ।

ঐক্য সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ইলিশ রপ্তারিকারক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ১ নভেম্বর থেকে এই ফিশারিঘাটে মাছ বিক্রি শুরু হয়েছে। ১ ও ২ নভেম্বর দুই শতাধিক ট্রলার থেকে আট মেট্রিক টন ইলিশ কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। একই সময় অন্যান্য প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ কিনেছেন ৪০ টনের বেশি। এসব মাছ ১২টি ট্রাকে বোঝাই করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রংপুর, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ দিয়েছেন। তবে আজ বেলা একটা পর্যন্ত চার মণ ইলিশও কেনা হয়নি। সব কটি ট্রলার সাগর থেকে ঘাটে ফিরেছে প্রায় ইলিশ ছাড়াই।

ভরা মৌসুমেও সাগরে ইলিশ নেই কেন, জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম খালেকুজ্জামান বলেন, সাগরে সব সময় ইলিশ ধরা পড়বে—এমন নয়। জেলেদের জালে লাক্ষ্যা, কোরাল, গুইজ্যা, পোপা, মাইট্যাসহ অন্যান্য প্রজাতির মাছ তো বেশ ধরা পড়ছে, ইলিশও একটা মাছ। তা ছাড়া এখন সাগরে মরাকটাল (স্থানীয় ভাষায় ডালা) চলছে। মরাকটালের সময় সাগরে ইলিশের বিচরণ তেমন থাকে না। আগামী ১৫ দিন পর সাগরে ভরাকটাল (স্থানীয় ভাষায় জো) শুরু হবে। তখন ইলিশের বিচরণ শুরু হবে, জালে ধরা পড়বে ইলিশ।

মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, জেলার টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদরে এখন প্রতিদিন ৫০ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ ধরা হচ্ছে। এর মধ্যে দুই থেকে তিন টন ইলিশ। ইলিশের আকৃতি বড়সড়। ওজনও বেশি। ভরাকটালের সময় ইলিশ আহরণ দৈনিক ২০ মেট্রিক টনও ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত সেপ্টেম্বর মাসে ধরা পড়েছিল ২ হাজার ২৬৩ মেট্রিক টন ইলিশ।

মৎস্য বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১৫ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন।