সিনহা হত্যা মামলার রায় ঘোষণার নির্ধারিত দিন কাল
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান (৩৬)। ঘটনার দেড় বছর পর আগামীকাল সোমবার এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণার জন্য আদালত দিন নির্ধারণ করেছেন।
মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ১২ জানুয়ারি রায়ের জন্য ৩১ জানুয়ারি দিনটি ধার্য করেন কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল। টেকনাফ মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ১৫ আসামির কী ধরনের শাস্তি হচ্ছে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহল-আলোচনা আছে।
আজ রোববার কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গণে কথা হয় টেকনাফের হ্নীলা এলাকার মুহাম্মদ আলমের সঙ্গে। আগামীকালের রায় শুনতে তিনি এখানে এসেছেন বলে জানালেন। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ী অভিযোগ তুলে প্রদীপের নেতৃত্বে পুলিশ তাঁর এক ভাইকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল আলম বলেন, ‘ঘোষণা অনুযায়ী আগামীকাল ৩১ জানুয়ারি আলোচিত সিনহা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। আমরা আদালতে সিনহা হত্যার বিষয়টি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের আশা, সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ অভিযুক্ত আসামিদের। করোনা মহামারির মধ্যেও স্বল্প সময়ে সিনহা হত্যার রায় দেশে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এ রায়ের মধ্যে দিয়ে বন্ধ হবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।’
সিনহা হত্যার রায় উপলক্ষে কক্সবাজারে এসেছেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরাও।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মুনীর উল গীয়াস বলেন, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে কড়া নিরাপত্তা থাকবে। মোতায়েন করা হবে অতিরিক্ত ফোর্স। বিচার চলাকালে আদালত প্রাঙ্গণে সর্বসাধারণের চলাচল সীমিত রাখা হবে। সিনহা হত্যা মামলার ১৫ আসামি কক্সবাজার কারাগারে আছেন। সকালে প্রিজন ভ্যানে আসামিদের আদালত প্রাঙ্গণে আনা হবে।
মামলার বাদী ও নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বলেন, সিনহাকে পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করা হয়েছে। হত্যার মূলে থাকা প্রধান দুই আসামি প্রদীপ-লিয়াকতের সর্বোচ্চ সাজা চান তিনি। বাকি আসামিদের সাজা হোক যাঁর যাঁর অপরাধের ভিত্তিতে। অভিযুক্ত আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত হলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে। এ রায়ের মাধ্যমে দেশের মানুষ জানবে, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, অপরাধ করলে শাস্তি ভোগ করতেই হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে নিহত হন সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় ২টি এবং রামু থানায় ১টি মামলা করে। সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং মাদক আইনে এসব মামলা করা হয়। টেকনাফ থানায় দায়ের করা দুই মামলায় নিহত সিনহার সঙ্গী সাইদুল ইসলাম সিফাতকে আসামি করা হয়। আর রামু থানায় মাদক আইনে করা মামলায় আসামি করা হয় সিনহার অপর সঙ্গী শিপ্রা দেবনাথকে।
নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস ২০২০ সালের ৫ আগস্ট বাদী হয়ে কক্সবাজার আদালতে টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে প্রধান করে নয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় টেকনাফ মডেল থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ২ নম্বর আসামি করা হয়। মামলার অপর সাত আসামি হলেন বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা।
মামলার তদন্তভার পায় র্যাব-১৫ কক্সবাজার। একই সঙ্গে পুলিশের করা তিনটি মামলার তদন্তও র্যাবের ওপর ন্যস্ত করেন আদালত।
২০২০ সালের ৬ আগস্ট মামলায় অভিযুক্ত নয়জনের মধ্যে সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। ওই দিন পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা নামের কোনো পুলিশ সদস্য জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন না।
২০২০ সালের ১১ আগস্ট গ্রেপ্তার করে পুলিশের দায়ের করা মামলার তিন সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আয়াজ ও নিজাম উদ্দিনকে।
২০২০ সালের ১৮ আগস্ট টেকনাফের মেরিন ড্রাইভের তল্লাশিচৌকির দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য এএসআই শাহজাহান মিয়া, কনস্টেবল মো. রাজীব ও কনস্টেবল মো. আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর র্যাব কনস্টেবল রুবেল শর্মাকে গ্রেপ্তার করে। কক্সবাজার জেলা কারাগারে থাকা এই ১৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া অন্য ১২ আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর র্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলাম ওসি প্রদীপসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে ১৪ জন কারাগারে থাকলেও টেকনাফ থানার কনস্টেবল সাগর দেব তখন পলাতক ছিলেন।
অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে। একই দিন পুলিশের দায়ের করা মামলা তিনটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করে পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। সেই সঙ্গে পুলিশের দায়ের করা তিনটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলা থেকে সাইদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা দেবনাথকে অব্যাহতি দেন আদালত।
এরপর মামলার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কক্সবাজার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহর আদালত থেকে জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালতে স্থানান্তর হয়। ২০২১ সালের ২৪ জুন পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
২০২১ সালের ২৭ জুন আদালত ১৫ আসামির বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরুর আদেশ দেন। সেই সঙ্গে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দিন ধার্য করেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে আদালতের বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ধার্য দিনগুলোয় সাক্ষ্য গ্রহণ সম্ভব হয়নি। পরে ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ দফায় ৮৩ জনের মধ্যে ৬৫ জন সাক্ষ্য প্রদান করেন।
সর্বশেষ অষ্টম দফায় ২৯ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন দিনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন হয়।
এরপর ৬ ও ৭ ডিসেম্বর আসামিরা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। সর্বশেষে ৯ থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত মামলায় উভয় পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত ৩১ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।