দৃষ্টিনন্দন সেতুটি নির্মাণকাজ শেষে ১৯৩৬ সালে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আসাম প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল কিনের নামে এই সেতুর নামকরণ হয় কিনব্রিজ। পরবর্তীকালে দিন দিন সেতুটি দেশ ও বিদেশে সিলেটের প্রতীক হয়ে ওঠে।

আট দশকের বেশি সময় ধরে সচল সেতুটি মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সংস্কারকাজ শেষে পুনরায় সেতুটিকে সচল করা হয়। নব্বই দশকের পর সিলেটে সুরমা নদীর ওপর আরও চারটি সেতু নির্মাণ করা হয়। লোহা দিয়ে তৈরি কিনব্রিজের আকৃতি অনেকটা ধনুকের মতো বাঁকানো। সেতুর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৫০ ফুট ও প্রস্থ ১৮ ফুট।

এখনো সচল আলী আমজদের ঘড়ি

কিনব্রিজের উত্তর পাড়ে আছে আরেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আলী আমজদের ঘড়িঘর। এটিও সিলেটের আরেকটি প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিনব্রিজ পার হয়ে শহরের উত্তর অংশের ঠিক প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আছে এটি ১৮৭৪ সাল থেকে। ওই বছর তৎকালীন বড়লাট লর্ড নর্থব্রুক সিলেট সফরে এসেছিলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার জমিদার নবাব আলী আহমদ খান ঘড়িটি নির্মাণ করেন। নামকরণ করেন নিজের ছেলে আলী আমজদ খানের নামে। ভারতের দিল্লির চাঁদনী চক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নবাব ঘড়িটি স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছিলেন বলে গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন।

ঘড়িটি দেখভাল করার দায়িত্বে আছে সিলেট সিটি করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আলী আমজদের ঘড়ির দৈর্ঘ্য ৯ ফুট ৮ ইঞ্চি ও প্রস্থ ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি। নিচ থেকে ছাদ পর্যন্ত উচ্চতা ১৩ ফুট, ছাদ থেকে ঘড়ি অংশের উচ্চতা ৭ ফুট, ঘড়ির ওপরের অংশের উচ্চতা ৬ ফুট। মোট উচ্চতা ২৬ ফুট। ঘড়িটির ডায়ামিটার আড়াই ফুট এবং ঘড়ির কাঁটা দুই ফুট লম্বা।

লোহার খুঁটির ওপর ঢেউটিন দিয়ে সুউচ্চ গম্বুজ আকৃতির এই ঘড়ি। এই নান্দনিক স্থাপনা যে কাউকে মুগ্ধ করে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা ঘড়িটি বিধ্বস্ত করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের পর কিছুসংখ্যক প্রবাসী, আরও পরে তৎকালীন সিলেট পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এটি সচল করতে উদ্যোগী হয়। বারকয়েক সংস্কার করা হলেও নানা সময়ে ঘড়িটি অচল হয়ে পড়ত।

সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, বিভিন্ন সময়ে ঘড়িটি অচল হয়ে পড়লে সিটি করপোরেশন সংস্কার করেছে। এখন ঘড়িটি সচল আছে এবং আগের মতোই শহরের বাসিন্দাদের সময় জানিয়ে যাচ্ছে।

স্মৃতিবিজড়িত সারদা হল

সুরমা নদীর পাড় ঘেঁষেই মিলনায়তনটি। ৮৬ বছর আগে কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের আদলে সারদা স্মৃতি ভবন নামের এ মিলনায়তন নির্মিত হয়। এর পর থেকেই নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় এখানে মঞ্চ মাতাতেন শিল্পীরা। তবে এখন মঞ্চে আলো জ্বলে না, মিলনায়তনে শোনা যায় না শিল্পীদের দরাজ কণ্ঠ। দীর্ঘদিন সংস্কারহীনতার কারণে এমন অবস্থা বলে সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ।

সিলেট নগরের কিনব্রিজ-সংলগ্ন এলাকায় ৩৯ শতক জায়গাজুড়ে সারদা স্মৃতি ভবনের অবস্থান। স্বদেশি আন্দোলনের নেতা, আইনজীবী, শিক্ষানুরাগী ও চা-ব্যবসায়ী সারদাচরণ শ্যামের (১৮৬২-১৯১৬) স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর ছোট ভাই বিমলাচরণ শ্যাম মিলনায়তনটি স্থাপন করেন। ১৯৩৬ সালের ২০ জানুয়ারি মিলনায়তনের উদ্বোধন করেন ভারতের আসাম প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর স্যার মাইকেল কিন। মিলনায়তনের নাম সারদা স্মৃতি ভবন হলেও এটি সারদা হল নামেই পরিচিতি পেয়েছে।

সংস্কৃতিকর্মীরা জানান, সে সময়ে সারদা হল তৈরিতে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। এর পুরো টাকাই দিয়েছিল শ্যাম পরিবারের পরিচালনাধীন ইন্দেশ্বর টি অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড। নির্মাণসামগ্রী কলকাতা থেকে জাহাজে করে সিলেটে আনা হয়েছিল। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে মিলনায়তনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল।

২০০৫ সালের ২৮ মে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নির্দেশনায় মিলনায়তনের মূল অবকাঠামো ও অবয়ব ঠিক রেখে সিলেট জেলা পরিষদ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সংস্কার শেষে ২০০৬ সালের ১ এপ্রিল ভবনের উদ্বোধন হয়। এর কয়েক বছর পর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মিলনায়তনটি আবার ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

সিটি করপোরেশন মিলনায়তনের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছে। তারা জানিয়েছে, ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থেই মিলনায়তনের মূল অবকাঠামো অক্ষত রেখে সারদা হলের সংস্কারের একটি পরিকল্পনা সিটি করপোরেশনের আছে। শিগগিরই এ উদ্যোগ নেওয়া হবে।