স্কুল প্রাঙ্গণে ২০ হাজার গাছ

লোহাগাড়ার পুটিবিলা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে গাছের পরিচর্যা করছে শিক্ষার্থীরা l প্রথম আলো
লোহাগাড়ার পুটিবিলা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে গাছের পরিচর্যা করছে শিক্ষার্থীরা l প্রথম আলো

সবুজে ঘেরা, ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা স্নিগ্ধ পরিবেশ। সারি সারি নানা জাতের গাছের সমারোহ। বনজ, ফলদ, ঔষধি, শোভা বর্ধনকারী—কিছুই যেন বাদ নেই। এমন চমৎকার পরিবেশ নিজের হাতে গড়েছেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার পুটিবিলা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আর তার স্বীকৃতি হিসেবে মিলেছে বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৪।
৬৬ বছর আগে লোহাগাড়ার প্রত্যন্ত পাহাড়ি টিলার ওপর গড়ে তোলা হয় পুটিবিলা উচ্চবিদ্যালয়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ছিল এটি। ২০১০ সালে বিদ্যালয়ের খালি জায়গায় গাছ লাগানোর কাজে হাত দেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। নিজস্ব ১০ একর জমিতে প্রায় ২০ হাজার গাছ লাগিয়ে সবুজের এক মায়াবি পরিবেশ গড়ে তোলেন তাঁরা।
শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, পড়াশোনায়ও সুনাম আছে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টির। গত বছর এসএসসিতে উপজেলার মধ্যে সেরা ফল করেছে। এ বছরও বিদ্যালয়টির পাসের হার ৮৫ শতাংশ।
শুরুর কথা: বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমির বেশির ভাগ অংশই এমনি পড়ে থাকে। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতার কথা বিবেচনা করে এর বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে আগামী প্রজন্মকে লেখাপড়ার পাশাপাশি গাছ লাগানোয় অভ্যস্ত করতে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানালেন প্রধান শিক্ষক মো. নাসির উদ্দিন। বললেন, ‘সবাই দারুণ উৎসাহ নিয়ে গাছ লাগানোর কাজে নেমে পড়ি। ২০১০ সালে প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী সবাই ১৫ থেকে ২০টি করে গাছ লাগিয়েছে। গাছ লাগিয়েছেন শিক্ষকেরাও। এই গাছগুলো এখন হয়েছে পাখিদের অভয়াশ্রম।’
শিক্ষার্থীরাই গাছগুলো পরিচর্যা করে। গাছের ডালপালা পরিষ্কার করে, পানি দেয়। নিজের হাতেই করে সব। সপ্তাহে এক দিন এই কাজ করে তারা। এটাকে তাদের কৃষিশিক্ষা এবং শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রধান শিক্ষক জানালেন, ব্যবহারিক এই ক্লাসের জন্য পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের নম্বরও দেওয়া হয়ে থাকে। গাছের সংখ্যার হিসাব দিয়ে তিনি জানান, বিদ্যালয় চত্বরে ১৫ হাজার বনজ, দুই হাজার ফলদ, ওষধি ৫০০, শোভাবর্ধনকারী প্রায় ১ হাজার ৫০০ ও দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় আরও কিছু গাছ মিলে প্রায় ২০ হাজার গাছ রয়েছে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিলের তিন লাখ টাকায় এসব গাছ রোপণ করা হয়।

স্কুল চত্বরে এক দিন: পুটিবিলা উচ্চবিদ্যালয় চত্বরে গিয়ে নানা জাতের সারি সারি গাছ দেখে মুগ্ধ হতে হয়। বনজ গাছের মধ্যে মেহগনি, আকাশমণি, তেলসুর, শাল, আগর ও ইউক্যালিপটাস গাছ বেশি চোখে পড়ে। আছে আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু, জলপাই, তেঁতুল, আমড়া, জাম্বুরাসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। নারকেল, সুপারির গাছও চোখে পড়ল। দেখা মিলল আমলকী, বহেড়া, অর্জুন, নিম, তেজপাতা গাছের। শোভাবর্ধনের জন্য লাগানো হয়েছে মহুয়া, ঝাউ, দেবদারু ও নাগেশ্বরগাছ। একটি নাগেশ্বরগাছে দেখা গেল বিশাল আকারের মৌচাক।

এই গাছগুলো এখন হয়ে উঠেছে পাখির অভয়ারণ্য। থেমে থেমে পাখির ডাকও শোনা গেল। ওড়াউড়ি করতে দেখা গেল বক, শালিক, চড়ুই ও কবুতরকে। কয়েকটি কাঠবিড়ালি এ গাছ-সে গাছ ছোটাছুটি করছে। খরগোশও ঘুরে বেড়াচ্ছে নিশ্চিন্ত মনে।

প্রতিটি বাগানের বিভিন্ন অংশ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সাইনবোর্ড লাগিয়ে ভাগ করা রয়েছে। শিক্ষক মাহবুবর রহমান বললেন, প্রত্যেক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা দুজন শ্রেণিশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে গাছের পরিচর্যা করে।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আসিফ চৌধুরী ও তছলিমা আক্তার জানায়, তাদের সঙ্গে গাছগুলোর অন্য রকম একটি বন্ধন তৈরি হয়েছে। সেই বন্ধনের বিষয়টি ভালোভাবে চোখে পড়ে প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের দিন। নিজের হাতে লাগানো গাছের কাছে গিয়ে অনেককে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। শিক্ষার্থী তাসমিন আক্তার ও সাহাবুদ্দিন জানায়, বিদ্যালয়ে গাছ লাগানো দেখে তারা নিজের বাড়িতেও কয়েকটি গাছের চারা রোপণ করেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোপাল বড়ুয়া জানান, আগামী প্রজন্মকে গাছ লাগানোয় উৎসাহিত করাও আমাদের এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাঁদের কথা: পুটিবিলা উচ্চবিদ্যালয় ০১৪ সালে এসএসসির ফলাফলের বিবেচনায় উপজেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে মনোনীত হয়। আগের দুই বছরও ভালো ফল করে। ওই তিন বছরের ফল বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ) থেকে এক লাখ টাকা আর্থিক অনুদান পায়। এসব তথ্য জানালেন লোহাগাড়া উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম চৌধুরী।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বিপুল কৃষ্ণ দাশ জানান, ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে বিদ্যালয়টি বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়।

বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি রিজিয়া রেজা চৌধুরী বলেন, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করতে স্কুল চত্বরে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখন বৃক্ষরোপণের স্বীকৃতি পেয়ে বিদ্যালয়ের সবার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।