default-image

রাজশাহী-নওগাঁ সড়কের দুই পাশে ছিল সারি সারি আমগাছ ও তালগাছ। এই সড়কের পাশে তালগাছ লাগিয়ে একজন ভিক্ষুক গহের আলী পরিবেশ পদক পেয়েছিলেন। সড়ক সম্প্রসারণের কারণে সেসব এখন শুধুই স্মৃতি। সেসব গাছের জায়গায় এখন বেড়ে উঠছে প্রকৃতিবিরুদ্ধ বিদেশি আকাশমণিসহ অন্য গাছ। দরপত্রে বনজগাছের সঙ্গে ফলদগাছ লাগানোর কথা থাকলেও তা লাগানো হচ্ছে না।

সম্প্রসারিত নতুন সড়কের পাশে গাছ লাগাচ্ছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। পরিবেশবিদেরা বলছেন, এই গাছের ফুলের রেণু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। গাছের পাতা মাটিতে পড়ে সহজে পচে না। গাছের নিচে কোনো আবাদও হয় না। ইতিমধ্যে সদ্য নির্মিত এই সড়কের ৪৫ কিলোমিটার এলাকায় এই বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। রাস্তার নির্মাণকাজ শেষে আরও ১০ কিলোমিটার এলাকায় এই গাছ লাগানো হবে। সড়কের পাশ দিয়ে কৃষিজমি রয়েছে। এই গাছের কারণে রাস্তার পাশের আবাদ হুমকির মুখে পড়বে।

সওজ সূত্র জানায়, সম্প্রতি রাজশাহী-নওগাঁ সড়কের ৪৫ কিলোমিটারের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। রাজশাহী শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কামারপাড়া এলাকা থেকে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার রানীপুকুর এলাকা পর্যন্ত নতুন এই সড়কের দুই পাশে দুজন ঠিকাদারের মাধ্যমে বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত এই গাছ লাগানো ও মরা গাছ প্রতিস্থাপন করার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর দরপত্র মূল্য ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ৭১০ টাকা। দরপত্রে এই রাস্তার পাশে শোভাবর্ধনকারী, বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগানোর কথা রয়েছে। একটি গাছের মূল্য ধরা হয়েছে ১২ টাকা করে।

২২ জুলাই রাজশাহী থেকে নওগাঁ পর্যন্ত সড়কের পুরো এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তায় লাগানো গাছের মধ্যে কোথাও কোনো ফলদ গাছ নেই। বেশির ভাগই আকাশমণি। রাস্তায় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের মধ্যে মান্দা উপজেলার ভ্যানচালক কাইমুদ্দিন (৫৫) রাস্তার পাশে লাগানো গাছের পাতা দেখে বললেন, ‘এটা আমাদের দেশি গাছ নয়।’ তার ভ্যানের যাত্রী ছিলেন একই উপজেলার সাহাপুর গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন (৫০)। তিনি বলেন, এই গাছ তাঁরা নিজের জমিতে লাগিয়েছিলেন। এ গাছের ফল পাখিতে খায় না। পাখি বাসাও বাঁধে না। গাছের পাতা মাটিতে পড়ে সহজে পচে না। যেখানে পড়ে, সেখানে অন্য ফসল হয় না। এ গাছের কাঠের যে খুব মূল্য আছে, তা–ও মনে হয়নি। তিনি আরও বলেন, এই সড়কে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আশির দশকে আমগাছ রোপণ করেছিল। রাস্তার দুই ধারে সেই আমগাছে যখন মুকুল আসত, তখন মনে হতো এটা যেন একটা স্বপ্নের সড়ক।

default-image

নওগাঁয় দীর্ঘদিন একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করছেন জাহিদুল ইসলাম (৩৫)। তিনি বলেন, এই সড়কের মহাদেবপুর এলাকায় ভিক্ষুক গহের আলী তালগাছ লাগিয়ে পরিবেশ পদক পেয়েছিলেন। সড়ক সম্প্রসারণের সময় স্থানীয় লোকজন গাছগুলো রেখে সড়ক সম্প্রসারণের দাবি জানিয়েছিলেন।

আকাশমণি গাছের ব্যাপারে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের সহকারী উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহীন সালেহউদ্দিন বলেন, এই গাছের ফুলের রেণু বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মানুষের ফুসফুসের ক্ষতি করে। শ্বাসকষ্টজাতীয় সমস্যার সৃষ্টি করে।

পক্ষীকুলের আশ্রয় ও খাদ্যনিশ্চিতকরণ প্রকল্পের উদ্ভাবক ও সমন্বয়কারী যশোধন প্রামাণিক সারা দেশে আদি দেশি গাছ রোপণের পক্ষে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, তাঁর প্রচেষ্টায় মন্ত্রণালয় থেকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদকে নিজ নিজ এলাকায় আদি দেশি গাছ রোপণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আকাশমণি আমাদের দেশীয় গাছ নয়। আমাদের প্রকৃতিবিরুদ্ধ। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। দেশের পাখিসহ জীবজগৎকে বাঁচানোর জন্য এই গাছ রোপণ না করে আদি দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করা জরুরি।’

কোনো কোনো এলাকায় শুধুই আকাশমণি গাছ লাগানো হয়েছে, অন্য গাছ নেই। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ঠিকাদার আবু জাহিদ বলেন, এলাকা ভাগ করে একটি নির্দিষ্ট জাতের গাছ লাগানো হয়েছে, যাতে ফুল ফুটলে ওই এলাকার রাস্তার দুই ধারে ফুলের শোভা ছড়িয়ে পড়ে।

রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী বৃক্ষপালনবিদ মো. জাহাঙ্গীর ফিরোজ দাবি করেন, তাঁদের দরপত্রে শোভাবর্ধনকারী, বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগানোর কথা রয়েছে। তাঁরা ফলদ গাছগুলো একটি কৌশলগত কারণে লাগাচ্ছেন না। কারণ, গাছের ফল রাস্তায় পড়লে তা কুড়াতে গিয়ে মানুষ আহত হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে তাঁরা ফলদ গাছ রোপণে নিরুৎসাহিত করছেন। তিনি এই দাবি করেন, শুধু আকাশমণি নয়, দরপত্রে উল্লেখিত অন্য সব গাছ মিলিয়েই লাগানো হয়েছে। আর আকাশমণি লাগানো যাবে না, ওপর থেকে এমন কোনো নির্দেশনাও নেই। শোভাবর্ধনকারী গাছের মধ্যে কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, কাঞ্চন, অর্জুন, জারুল ও সোনালুগাছের পর্যাপ্ত চারা পাওয়া যায় না। এ জন্য এগুলো কম মনে হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন