বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসডির অর্থায়নে আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিশের ইকোফিশ বাংলাদেশ প্রকল্প-২-এর গবেষকেরা ২০১৮ সাল থেকে নদ-নদীর পাঙাশ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। ২০২০ সালে পটুয়াখালী অঞ্চলের গলাচিপা উপজেলার চর কাজল, চর বিশ্বাস ও বন্যাতলী এবং রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া, চর কাসেম, আন্ডার চর, সোনার চর এলাকায় সাতটি পয়েন্টে পাঙাশ ও এ-জাতীয় মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। দেশে ক্যাটফিশের সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে এটাই প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাকাজ বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গবেষকেরা বলেছেন, পাঙাশ দ্রুত বর্ধনশীল ক্যাটফিশ প্রজাতি মাছের একটি। এই মাছের ওজন ৬০ কেজি পর্যন্ত হয়। দেশে ইলিশের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী মাছের তালিকায় আছে ক্যাটফিশ। ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, শুধু নদ-নদী থেকে পাঙাশের জোগান এসেছে ১১ হাজার মেট্রিক টন।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাঁই দিয়ে সহজেই পাঙাশের পোনা ধরা যায়। তাই জেলেরা পাঙাশের পোনা ধরতে চাঁই বেশি ব্যবহার করছেন। চ্যাপাশুঁটকি ও খইল একত্রে আবদ্ধ পাত্রে রেখে প্রায় ছয় মাস ধরে পচানো হয়। এরপর এর সঙ্গে চিনি, চিড়া, ময়দা ও মাছের তেল মেশানো হয়। আঠালো করার জন্য এই খাবার পরবর্তী সময়ে রোদে শুকানো হয়। চাঁইয়ের মধ্যে এই খাবার রেখে তা পাঙাশের বিচরণক্ষেত্রের পানিতে নিমজ্জিত করা হয়। পরে তুললেই পাঙাশের পোনায় ভরে যায় চাঁই। অনেক জেলে ‘গফ্ফা’ অথবা ‘ঝাই’ জাল দিয়ে পাঙাশের পোনা ধরে থাকেন।

default-image

মৎস্য আইন অনুযায়ী, ১২ ইঞ্চির নিচে পাঙাশ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও জেলেরা তা মানছেন না। ইকোফিশ বাংলাদেশ প্রকল্প-২ থেকে জানা গেছে, ২০২০ সালে পটুয়াখালী জেলায় বিচরণক্ষেত্র থেকে পাঙাশের পোনা ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৮২৫ মণ। ২০২১ পোনা ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৩৯০ মণ। আর চলতি মৌসুমে গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চার মাসে নদ-নদী থেকে পাঙাশের পোনা ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৩৪০ টন।
পটুয়াখালীর শহরের বিভিন্ন মাছবাজার ছাড়াও গলাচিপা ও রাঙ্গাবালীর বিভিন্ন বাজারে খোলামেলা পাঙাশের পোনা বিক্রি করতে দেখা গেছে। মঙ্গলবার সকালে শহরের নিউমার্কেট মাছবাজারে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন খুচরা ব্যবসায়ী খোলামেলাই পাঙাশের পোনা বিক্রি করছেন। প্রতি কেজি পাঙাশের পোনা ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা করে বিক্রি করতে দেখা যায়।

নিউমার্কেটের মাছ ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, বাজারে প্রচুর পাঙাশের পোনা উঠছে। এই অঞ্চলে যে পরিমাণে পাঙাশের পোনা অবৈধভাবে ধরা হয় সেসব যদি রক্ষা করা যেত, তাহলে এ অঞ্চলকে ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশের খনিতে রূপান্তরিত হতে পারত।

ইউএসএইড, ইকোফিশ-২ ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের পটুয়াখালীর সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ২০১৫ সাল থেকে দেশে জাটকা ধরা বন্ধ, ইলিশ ও অন্যান্য মাছের প্রজনন বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারিগরি ও গবেষণায় অংশীদার হিসেবে কাজ করছেন। ফলে কয়েক বছর ধরে ইলিশের পরিমাণ বেড়েছে। ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির প্রভাবে নদ-নদীতে অন্যান্য মাছও বেড়েছে।

সাগরিকা জানান, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) ২০২০ সালে দেশীয় পাঙাশ মাছকে লাল তালিকাভুক্ত করেছিল। তবে ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির প্রভাবে নদীতে ক্যাটফিশ-জাতীয় মাছও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইলিশের মতোই ক্যাটফিশের ভান্ডার ও প্রজননস্থলগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো আলাদা ব্যবস্থাপনায় এনে সংরক্ষণের আওতায় আনার লক্ষ্যে কৌশল ও ব্যবস্থাপনাপত্র তৈরির কাজ চলছে। সরকার ইলিশ রক্ষায় যেভাবে অভয়াশ্রম ঘোষণা, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, তেমনি দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় একইভাবে অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে বলে মনে করেন এই গবেষক।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্ল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, নভেম্বর থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ৯ মাস ৩০ সেন্টিমিটার/১২ ইঞ্চির ছোট আকারের পাঙাশ নিজেদের দখলে রাখা, বহন, পরিবহন, বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে কিছু অসাধু জেলে বিভিন্ন উপায়ে নদ-নদী থেকে পাঙাশ পোনা ধরছে। মৎস্য অধিদপ্তর বিভিন্ন প্রজননস্থলের পাঙাশ পোনা ধরায় স্থাপিত অবৈধ চাঁই উচ্ছেদ ও জাল জব্দ করার অভিযান শুরু করেছে। পাঙাশ রক্ষায় তাঁদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন