বিজ্ঞাপন

আজ বেলা দেড়টায় হাসপাতালটির তৃতীয় তলার মহিলা সার্জারি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, আহত শ্রমিকদের সবাই তখন স্বজনদের সহযোগিতায় হাসপাতাল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। জীবন বাঁচাতে লাফিয়ে পড়ে তাদের কেউ পাঁজর, দাঁত, আবার কেউ হাত-পা ভেঙেছেন।

১৪ বছরের কিশোরী সোমা সেদিন কাজ করছিল ভবনটির দোতলায়। আগুনের ধোঁয়া সহ্য করতে না পেরে দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে। আর তাতেই সোমার বাঁ হাত ভাঙে। প্রথম আলোকে সোমা বলে, ‘লাফ দেওয়ার পর আর কিছু মনে নাই। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমি হাসপাতালে। তখন থেইকাই হাতে অনেক ব্যথা। রাত হইলে ব্যথা বাড়ে। ঘুমাইতে পারি না।’ সোমার বাবা আবদুল কাদির বলেন, ‘ডাক্তার জানাইছে মেয়ের হাত পুরাটাই ভাঙছে। ভালা করতে হইলে জরুরি অপারেশন লাগব। না হয় হাতে ইনফেকশন হইব।’

ওই সাত শ্রমিক গত বৃহস্পতিবার ছয়তলা ভবনটিতে আগুন লাগার পর বিভিন্ন ফ্লোর থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। এরপর থেকে স্থানীয় ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

তবে অস্ত্রোপচার ছাড়াই আজ সোমাকে হাসপাতাল ছাড়তে হয়েছে। সোমার বাবা বলেন, অস্ত্রোপচার করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কারখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া চিকিৎসার ব্যয়সংক্রান্ত অনাপত্তিপত্র দেখতে চেয়েছিলেন। তখনই কারখানায় ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। কারখানা কর্তৃপক্ষ তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল, তারা হাসপাতালে এসে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু তারা (কারখানা কর্তৃপক্ষ) আর আসেনি।

default-image

আবদুল কাদির বলেন, ‘কারখানায় গেছিলাম। পুলিশের এক বড় সাব আমারে কারখানার অফিসারের কাছে নিয়া গেছিল। আমি বড় সাহেবরে কইলাম, আপনাগো একটা সই লাগব। তইলে মাইয়াডার অপারেশন হইব। পুলিশের সামনে উনি সই দিতে রাজি হইলেন। পরে পুলিশ চইলা যাওয়ার পরে আমারে কইল, তাঁরা রাইতে হাসপাতালে আইয়া ডাক্তারের লগে কথা কইব। আমরা তো অপেক্ষা করছি। ওনারা কেউ আসেন নাই। এর মধ্যে সকালে (বুধবার) নার্স আইসা কইল, আমাগোরে আইজকা হাসপাতাল ছাড়তে হইব।’ তবে ওই কারখানা কর্মকর্তার নাম বলতে পারেননি কাদির। ইচ্ছের বিরুদ্ধেই হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান কাদির। তিনি আরও বলেন, গত রাত থেকে সোমার হাতে ব্যথার সঙ্গে চুলকানি শুরু হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় চিকিৎসা শেষ না করেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। মেয়ের চিকিৎসা নিয়ে শঙ্কায় তিনি। রাতে পরিবার নিয়ে কিশোরগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন। সরকারের দেওয়া ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে ধারদেনা করে মেয়ের হাতে অস্ত্রোপচার করবেন বলে জানান কাদির।

প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আহত রোজিনা, নাদিয়া, মারিয়া, মনোয়ারা, রোমা ও আশরাফুল। তাঁরা জানিয়েছেন, বুধবার সকালে হঠাৎ করেই তাঁদের হাসপাতাল ছাড়তে বলা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চাইলে তাঁরা পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে পারবেন। তবে সে ক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যয় নিজেদেরই বহন করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় বহন করার ক্ষমতা তাঁদের নেই। বাধ্য হয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাঁরা হাসপাতাল ছেড়েছেন।

এ সময় আহত রোজিনার ভাই মো. তানিম বলেন, বের হওয়ার সময় তাঁদের কাউকেই হাসপাতাল থেকে কোনো প্রকার ওষুধ দেওয়া হয়নি। রাত থেকেই নিজেদের টাকায় ওষুধ কিনতে হবে তাঁদের।

তবে জানতে চাইলে ইউএস–বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক (অপারেশন) এ কে এম জোনায়েদ বলেন উল্টো কথা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সুস্থ হওয়ার পরই আহত শ্রমিকেরা হাসপাতাল ছেড়েছেন। চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে তাঁদের ভাবতে হয়নি। মালিকপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা এই শ্রমিকদের সব চিকিৎসা ব্যয় বহন করবেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে হাসেম ফুড লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস) নাহিদ মুরাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক আহত শ্রমিকদের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। তাঁদের চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো জটিলতা হওয়ার কথা না। অস্ত্রোপচারও হওয়ার কথা ছিল। কেন হয়নি, সেটা বলতে পারছি না।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন