
সোনার বা সাউন্ড নেভিগেশন অ্যান্ড রেইনজিং যন্ত্র। পানির তলদেশ থেকে এই যন্ত্র শব্দবার্তা পাঠায় কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত মনিটরে। এ মনিটরটি থাকে জাহাজে। এরপর জাহাজে থাকা গবেষকেরা মনিটরে আসা তথ্য গণনা ও পর্যালোচনা করেন। পর্যালোচনার পর সাগরের তলদেশের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে মাছের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পান গবেষকেরা।
বঙ্গোপসাগরে মৎস্য অনুসন্ধানে নামা ‘আর ভি মীন সন্ধানী’ নামের জরিপ ও গবেষণা জাহাজে রয়েছে সোনার। ইকো সাউন্ড, কারেন্ট ইন্ডিকেটরসহ অত্যাধুনিক আরও বেশ কিছু যন্ত্র রয়েছে জাহাজটিতে। এসব যন্ত্র ব্যবহার করে মৎস্য জরিপকাজ চালাতে ১ ডিসেম্বর থেকে বঙ্গোপসাগরে নেমেছে জাহাজটি। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৭ বছর পর বঙ্গোপসাগরে মৎস্য জরিপের কাজ শুরু হলো।
মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর এখন দেশের সমুদ্র অঞ্চলের আয়তন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। বিশাল এ অঞ্চলে জরিপকাজ চালাবে জাহাজটি। গত ১৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আর ভি মীন সন্ধানীর উদ্বোধন করেন। জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৩৭ দশমিক ৮ মিটার, প্রস্থ ৯ দশমিক ২ মিটার। পানির নিচে থাকবে জাহাজের কাঠামোর প্রায় ৪ মিটার (ড্রাফট)।
মৎস্য দপ্তর সূত্র জানায়, কোনো জরিপ ও গবেষণা ছাড়াই ১৭ বছর ধরে অনুমানের ভিত্তিতে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের কাজ চলছিল। ফলে মাছের মজুত এবং মজুতের সঙ্গে মাছ আহরণের তুলনামূলক চিত্র কী, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। এ ছাড়া সাগরের কোন কোন স্তরে মাছ আহরণ করা যাচ্ছে না, তা-ও বের করা যাচ্ছিল না। মালয়েশিয়া থেকে আনা নতুন জরিপ জাহাজ আর ভি মীন সন্ধানীর মাধ্যমে কাজগুলো করা সম্ভব হবে। সাগরের তলদেশে মাছের অবস্থান, কোন প্রজাতির মাছ কী পরিমাণে রয়েছে, কোনো প্রজাতি কমে গেছে কি না, তা-ও জানা যাবে। মাছের প্রজননক্ষেত্র, সাগরে খাদ্যকণা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে।
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক নাসির উদ্দিন মো. হুমায়ূন বলেন, ১ ডিসেম্বর থেকে জরিপ জাহাজটি সাগরে পরীক্ষামূলকভাবে জরিপ ও গবেষণাকাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে সাগরের তলদেশে, পানির বিভিন্ন স্তরে ও ভাসমান নতুন নতুন মৎস্যক্ষেত্র আবিষ্কার করা যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
জাহাজটির মাধ্যমে মৎস্য জরিপের কাজটি করবে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর, তবে জাহাজাটি পরিচালনের দায়িত্বে রয়েছে নৌবাহিনী। বর্তমানে জাহাজটি টেকনাফের অদূরে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এতে ৬ জন মৎস্য গবেষক রয়েছেন। প্রথম দফায় প্রায় ১২ দিন এটি জরিপকাজ চালাবে।
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের পরিচালক এ বি এম আনোয়ারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাশিয়া থেকে আনা একটি জাহাজের মাধ্যমে মৎস্য জরিপ করা হতো। পরে আরও দুটি জাহাজ আনা হয়েছিল। একপর্যায়ে দুটি জাহাজই অকেজো হয়ে যায়। ২০০০ সালের পর থেকে জরিপকাজ কার্যত বন্ধ ছিল।
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর সূত্র জানায়, বঙ্গোপসাগর থেকে গত বছর ৮০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে বাংলাদেশ আহরণ করেছে ১ লাখ টনেরও কম। এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য অনুসন্ধান ও জরিপের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজের পরিচালক অধ্যাপক মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, এত দিন সাগরে অনুমানের ভিত্তিতে মাছ ধরা হতো। কোন প্রজাতির কত মাছ রয়েছে, সে ধারণাও ছিল না। জাহাজের মাধ্যমে জরিপ ও গবেষণার কাজ শুরু হলে মাছের প্রজাতি ও পরিমাণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।