default-image

৯৬ বিঘা জমিজুড়ে দুই বছর আগে ১২ হাজার ৮০০টি আমের গাছ লাগিয়েছিলেন নওগাঁর সাপাহার উপজেলার কৃষক সাখাওয়াত হাবিব (৪৫)। ১০ মাস আগে সেই বাগানের আমগাছের সারির ফাঁকা জায়গায় বিভিন্ন জাতের ১১ হাজার ৭০০টি বরইগাছ লাগান। আমগাছগুলো থেকে গত বছরই ফলন পান। আর এবারই প্রথম বরইগাছগুলোতে বরই ধরেছে। এক সপ্তাহ ধরে বরই বিক্রি শুরু করেছেন সাখাওয়াত। প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ মণ বরই নামছে তাঁর বাগান থেকে।

সাখাওয়াতের এই মিশ্র ফলের বাগান উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের শিরন্টি ইউনিয়নের ফুটকইল গ্রামে। তাঁর এই বাগান থেকে গত বছর শুধু আম বিক্রি করেছিলেন ২৫ লাখ টাকার। এ বছর মুকুল আসার পরপরই সম্ভাব্য ফলন ধরে নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে ৪১ লাখ টাকায় বিক্রির চুক্তি করেছেন। আর বরই বিক্রির আশা করছেন ৭০ লাখ টাকার। সব মিলিয়ে মিশ্র বাগান থেকে এ বছরে প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন সাখাওয়াত।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে পরিপক্ব হওয়ার পর এ পর্যন্ত বরই বিক্রি হয়েছে ১৭ লাখ টাকার। সাখাওয়াতের এমন সাফল্য দেখে মিশ্র বাগান করার পরামর্শ নিতে অনেকেই যোগাযোগ করছেন তাঁর কাছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সাখাওয়াতের বাগান গিয়ে আম্রপালি, আশ্বিনা, গৌড়মতি জাতের আমগাছ দেখা যায়। এসব গাছের সারির ফাঁকে আছে বল সুন্দরী, কাশ্মীরি আপেল, বেবি কুল ও থাইকুল জাতের বরইগাছ। আমগাছগুলোতে মুকুল এসেছে। বরইগাছগুলো ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। বাগানে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে পাকা বরই সংগ্রহ করেন। বাগানেই তা কিনতে আসেন রাজশাহী, পাবনার ব্যবসায়ীরা। জাতভেদে প্রতি মণ বরই পাইকারি বিক্রি হয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়।

বাগানে ঘুরতে ঘুরতে সাখাওয়াত হাবিব বলেন, ২০১৮ সাল থেকে ফুটকইল গ্রামের মাঠে ৯৬ বিঘা জমি ১২ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন তিনি। বছরে প্রতি বিঘা জমির জন্য মালিকদের ৩০ হাজার টাকা করে দিতে হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাগান পরিদর্শনে এসে সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমগাছের সারির ফাঁকা জায়গুলোতে বরইগাছ লাগানোর পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শমতো চুয়াডাঙ্গার জীবননগর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বরইয়ের চারা সংগ্রহ করেন। গত বছরের মে মাসে তিনি এসব চারা রোপণ করেন। চারা লাগানোর ৮ মাসের মাথায় ডিসেম্বর মাসে গাছগুলোতে ফুল আসে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফল পরিপক্ব হয়। এরপর থেকে বিক্রি শুরু করেছেন। ৯৬ বিঘা জমিতে বরই চাষ করতে সাখাওয়াতের খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

বর্তমানে বরই চাষ হওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর। সাখাওয়াতের সফলতা দেখে অনেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
মজিবর রহমান, সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা

সাখাওয়াতের গ্রামের বাড়ি জেলার পত্নীতলা উপজেলার শিহাড়া ইউনিয়নের গোবিন্দবাটি গ্রামে। ২০০৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তখন বড় ভাই হারুনুর রশিদ বাসায় বসে না থেকে আমবাগান ইজারা নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন। ২০০৭ সালে নিজের মোটরসাইকেল ও মায়ের দেওয়া একটি গাভি বিক্রি করে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় পত্নীতলার নির্মইল এলাকায় এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১২ বিঘার আমের বাগান তিন বছরের জন্য ইজারা নেন। ওই বাগান পরিচর্যা করে পরের বছরই আম বিক্রি করেন ৪ লাখ টাকার। লাভের টাকা খরচ না করে ১২ হাজার টাকা চুক্তিতে ১২ বছরের জন্য আরও ২০ বিঘা জমি ইজারা নেন। সেখানেও গড়ে তোলেন আমের বাগান। এরপর প্রতিবছর পুঁজি বাড়তে থাকলে সাখাওয়াত তাঁর জমির পরিমাণও বাড়ান।

সাপাহার ফুটকইল এলাকার ৯৬ বিঘার মিশ্র ফলের বাগান ছাড়াও সাপাহার ও পত্নীতলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে সাখাওয়াতের ৩৫০ বিঘার আমবাগান আছে। এসব বাগানে প্রায় তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

সাখাওয়াত বলেন, পৈতৃক সূত্রে ছয় বিঘা জমি পেয়েছিলেন। বাগান করে সফলতা পাওয়ায় বর্তমানে নিজের মালিকানায় আছে ৫০ বিঘা কৃষিজমি। সাপাহার উপজেলা সদরে জায়গা কিনে চারতলা ভবন করেছেন। সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকেন।

মিশ্র ফলের বাগানের সফলতার বিষয়ে সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মজিবর রহমান বলেন, জেলার সাপাহার, পোরশা ও পত্নীতলা উপজেলায় ইদানীং ধান চাষ ছেড়ে মানুষের মধ্যে ফলের বাগান গড়ে তোলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমের পাশাপাশি প্রতিবছরই উপজেলায় বরইয়ের চাষ বাড়ছে। বর্তমানে বরই চাষ হওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ হেক্টর। সাখাওয়াতের সফলতা দেখেও অনেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন