default-image

বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী; বিখ্যাত মিষ্টিপানের জন্য। এরপরেই লবণ। এখানকার লবণ কক্সবাজারের অন্য উপকূলে উৎপাদিত লবণের তুলনায় উন্নত, অর্থাৎ লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি। ফলে দামেও চড়া। একসময় চড়া মূল্যে বিক্রি হওয়ায় স্থানীয় ব্যক্তিরা লবণকে ‘সাদা সোনা’র সঙ্গে তুলনা করেন।

কিন্তু করোনা মহামারির কালে এসে যেন জৌলুশ হারিয়েছে মহেশখালীবাসীর সাদা সোনা। ২০ মণ লবণ বিক্রি করে এখন এক বস্তা চালও কিনতে পারছেন না চাষিরা, বরং লবণ বেচে বিনিয়োগের টাকা তুলতে না পারায় গুনতে হচ্ছে লোকসান। অথচ প্রচণ্ড গরমে এবার লবণের ভালোই উৎপাদন হয়েছে। এখন কালবৈশাখীর ঝড়–বৃষ্টিতে মাঠের লবণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় চাষিরা।

প্রান্তিক পর্যায়ে বাজারের এমন অবস্থার জন্য ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বড় ব্যবসায়ীদের দুষলেন কক্সবাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। আবার কতিপয় প্রভাবশালী শিল্পের কাঁচামাল আমদানির নামে সোডিয়াম সালফেট এনে বাজারজাত করায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

বিজ্ঞাপন

সাদা সোনায় ভরপুর মাঠ, তবু হতাশা

১১ এপ্রিল সকাল ৯টা। কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদী থেকে দ্রুতগতির স্পিডবোটে বঙ্গোপসাগর চ্যানেল পাড়ি দিয়ে গেলাম মহেশখালী দ্বীপের গোরকঘাটা জেটিতে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় (সড়কপথে) উত্তর দিকে ২৫ কিলোমিটার গেলে পাহাড়ঘেরা ইউনিয়ন কালারমারছড়া। ইউনিয়নের উত্তর দিকে উত্তর নলবিলা গ্রাম, তারপর দরকাঘোনা এলাকা। এলাকাটি যেন সাদা সোনায় ভরপুর। খোলা মাঠে পড়ে আছে লবণের অসংখ্য স্তূপ। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে চাষিরা ব্যস্ত লবণ উৎপাদনে। প্রখর সূর্যতাপে লবণের বাম্পার উৎপাদন হলেও চাষিদের মুখে হাসি নেই।

প্রতিবছর নভেম্বর মাসে লবণ উৎপাদনের তোড়জোড় শুরু হয়। প্রথমে মাঠ পরিচর্যা, তারপর সমুদ্রের লোনা পানি ধরে রাখার জন্য মাঠে তৈরি হয় ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে চারকোনাবিশিষ্ট কক্ষ বা ঘর। সেই ঘরে বিছানো হয় কালো পলিথিন। তারপর পলিথিনের ওপর লোনা পানি জমিয়ে সূর্যের তাপে শুকিয়ে উৎপাদিত হয় লবণ। ১৫ ডিসেম্বর থেকে লবণ উৎপাদন শুরু হয়ে চলে ১৫ মে পর্যন্ত, টানা পাঁচ মাস।

দরকাঘোনার এক পাশে লবণ উৎপাদন করছেন প্রান্তিক চাষি মোহাম্মদ ইউসুফ। সঙ্গে তাঁর ১২ বছরের কিশোরী মেয়ে সালমা। কাছে গিয়ে লবণের বাজার নিয়ে কথা শুরু করতেই খানিক্ষণ চুপ থাকেন ইউসুফ (৪০)। এরপর বললেন, এক মণ (৪৭ কেজিতে একমণ) লবণ উৎপাদন করতে তাঁর খরচ যাচ্ছে ২৪০ টাকা, অথচ বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। প্রতি মণে তাঁর লোকসান যাচ্ছে ১১০ টাকা। লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে গুনতে এখন ফতুর হওয়ার অবস্থা।
মোহাম্মদ ইউসুফ এবার ৬০ শতক জমিতে লবণের চাষ করছেন। বেশি দামে বিক্রির জন্য ২০ মণের বেশি লবণ মাঠের এক কোণে স্তূপ করে রেখেছেন। কিন্তু কালবৈশাখীর ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কাও তাঁর মনে। তিনি বলেন, আকাশের মেঘের আনাগোনা চলছে, ঝড়-বৃষ্টি হলে সর্বনাশ হবে। বৃষ্টিতে ভিজে লবণ নষ্ট (গলে) হলে পথে বসতে হবে।

লবণের মাঠে মেয়ে কেন? মোহাম্মদ ইউসুফের সাফ জবাব, জমি বর্গা নিয়ে লবণ চাষ করছেন। লবণ বিক্রি না হওয়ায় এখনো জমির মালিকের টাকা পরিশোধ করতে পারেননি, শ্রমিক খরচ চালাবেন কোত্থেকে, তাই কাজে সহযোগিতার জন্য মেয়েকেও মাঠে এনেছেন।

কালারমারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারেক বিন ওচমান শরীফ বলেন, এই ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার একর জমিতে লবণের উৎপাদন হচ্ছে। লবণ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত আছেন অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ। প্রচণ্ড গরমে লবণের বাম্পার উৎপাদন হলেও নায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ চাষিরা। এখন করোনা মহামারিতে লবণ বেচাবিক্রিও কমে গেছে। আসন্ন রমজান মাস ও রোজার ঈদ নিয়ে চিন্তিত চাষিরা।

default-image

কালারমারছড়ার উত্তরে মাতারবাড়ী ইউনিয়ন। আগে এই ইউনিয়নে ৪ হাজার একরের বেশি জমিতে লবণ উৎপাদিত হতো। চলতি মৌসুমে হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ২০০ একরে।

এর কারণ জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ কারণে অধিগ্রহণকৃত জমিতে লবণ উৎপাদন বন্ধ আছে। ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজার ২০০ একর জমিতে লবণের উৎপাদন হলেও লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে প্রান্তিক চাষিদের। মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ীরা প্রতি মণ লবণ ১৩০ টাকার বেশি দামে কিনতে রাজি হচ্ছেন না।

বিজ্ঞাপন

২০ মণ লবণে মিলছে না ১ বস্তা চাল

মহেশখালীর কালারমারছড়া, মাতারবাড়ী ও গোরকঘাটার লবণচাষি মোহাম্মদ রফিক, সিরাজুল ইসলাম ও বেলাল হোসাইন বলেন, বাজারে চাল, তেল, শাকসবজি থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে, অথচ লবণের দাম ক্রমান্বয়ে তলানিতে যাচ্ছে। এখন ২০ মণ লবণ বিক্রি করেও উন্নত মানের ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা চাল পাওয়া যাচ্ছে না।

হিসাব কষে তাঁরা বলেন, প্রতি মণ লবণ ১৩০ টাকা হলে ২০ মণে পাওয়া যায় ২ হাজার ৬০০ টাকা। আর ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা চাল বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০-৩ হাজার ২০০ টাকায়। স্বাধীনতার পর এত কম দামে তাঁরা লবণ বিক্রি করেননি।

পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নে লবণ উৎপাদন হচ্ছে অন্তত ছয় হাজার একরে। দাম কমে যাওয়ায় সেখানকার চাষিরাও পড়েছেন বিপাকে।

ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ ওয়াসিম বলেন, নায্যমূল্য না পেলে ইউনিয়নের পাঁচ হাজার চাষি পথে বসবেন। এখানেও লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়।

ঢাকা–নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কারণে দামে ধস?

উপজেলার গোরকঘাটা, বড় মহেশখালী, ছোট মহেশখালী, কুতুবজোম, হোয়ানক, ধলঘাটা ইউনিয়নেও অন্তত ৭ হাজার একরে লবণ উৎপাদন হচ্ছে। মাঠ থেকে কেনা লবণ ট্রাক কিংবা কার্গোবোটে বোঝাই করে সরবরাহ হচ্ছে চট্টগ্রামের পটিয়া, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনা এলাকায়।

চলতি এপ্রিলের প্রথম ১০ দিনে চারটি কার্গো বোঝাই করে প্রায় ৮ হাজার মণ লবণ নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ করেছেন চকরিয়ার বদরখালী এলাকার ব্যবসায়ী সরওয়ার আলী। মাঠ থেকে তিনি প্রতি মণ লবণ কিনেছেন ১৩০ টাকায়, সেই লবণ নারায়ণগঞ্জে বিক্রি করেন ১৯৫ টাকায়।

প্রতি মণে ৬৫ টাকা লাভ! জবাবে সরওয়ার আলী বললেন, এত টাকা লাভ হলে তো সবাই লবণ ব্যবসায়ী হয়ে যেতেন। মাঠ থেকে ১৩০ টাকায় এক মণ লবণ নারায়ণগঞ্জে পৌঁছাতে খরচ যায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এর মধ্যে মাঠ থেকে ট্রাক কিংবা কার্গোতে বোঝাই করতে শ্রমিক খরচ যায় ২০-২৫ টাকা, ট্রাক অথবা কার্গো ভাড়া লাগে ৩৭ টাকা, আড়তের কমিশন দিতে হয় ৮ টাকা। সব মিলিয়ে লাভ থাকে ৫ থেকে ৭ টাকা। কোনো কোনো সময় আবার লোকসানও যায়। তিনি বলেন, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা মিলেমিশে লবণের দাম কমিয়ে দিয়েছেন। কয়েক মাস আগেও নারায়ণগঞ্জে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছে ৩৬০ টাকায়।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে (২০২১ সালে) লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২২ লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টন। গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছে ১০ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছর এ সময়ে উৎপাদিত হয়েছিল ১১ লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন। এবার প্রায় ৩ হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকায় উৎপাদনও কমে গেছে। চলতি মৌসুমে কক্সবাজারের ৫৪ হাজার ৬৫৪ একর জমিতে লবণ উৎপাদিত হচ্ছে।

সোডিয়াম সালফেট আমদানি বন্ধের দাবি

কক্সবাজার লবণচাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি শহিদ উল্লাহ বলেন, ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় জেলায় উৎপাদিত প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন লবণ পড়ে আছে মাঠে, লোকসান দিয়েও বিক্রি করতে পারছেন না চাষিরা। মাঠে প্রতি কেজি লবণ বিক্রি হচ্ছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকায়। অথচ খুচরা বাজারে প্যাকেটজাত প্রতি কেজি লবণ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪৫ টাকায়।

শহিদ উল্লাহ বলেন, কতিপয় ব্যবসায়ী শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিদেশ থেকে সোডিয়াম সালফেট লবণ আমদানি করে বাজার সয়লাব করছেন। আর এতে কপাল পুড়ছে কক্সবাজারের ৫৫ হাজার প্রান্তিক চাষিসহ লবণ উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত পাঁচ লাখ মানুষের। তিনি বলেন, গত ৩১ মার্চ সোডিয়াম সালফেট আমদানি বন্ধের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি পাঠানো হয়। স্মারকলিপির অনুলিপি সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরে পাঠানো হয়, কিন্তু কাজ হচ্ছে না।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, ভোজ্যলবণ আমদানিতে বিধিনিষেধ থাকায় কতিপয় প্রভাবশালী শিল্পের কাঁচামাল আমদানির নামে সোডিয়াম সালফেট এনে বাজারজাত করছেন। এ সুযোগে মিলের (লবণ) মালিকেরা দেশীয় লবণ ক্রয় বন্ধ করে সোডিয়াম সালফেটের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এ কারণে মাঠে উৎপাদিত লবণ বিক্রি হচ্ছে না।

default-image

মহেশখালীর লবণচাষি হাসানুল আবেদীন চৌধুরী বলেন, চলতি মৌসুমে কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তিনি ৩০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন শুরু করেন। ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ৭০ লাখ টাকা দামের ৪৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন করেন, কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে প্রতি মণে ১১০ টাকা লোকসান গুনে।

টেকনাফ লবণ চাষি সংগ্রম পরিষদ সভাপতি মো. শফিক মিয়া বলেন, ‘৩০ একরের বেশি জমিতে লবণ উৎপাদন করেও লাভের মুখ দেখব দূরের কথা, মূল খরচও তোলা যাচ্ছে না। সোডিয়াম সালফেট স্থানীয় লবণের বাজার শেষ করে দিচ্ছে। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে সোডিয়াম সালফেট লিকুইড আমদানি হলে এ সমস্যা হতো না।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন প্রকল্পের উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল বলেন, বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বন্ধ আছে, কিন্তু সোডিয়াম সালফেট আমদানি বন্ধ করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব না। তা ছাড়া লবণের দাম নির্ধারণ করে বাজার, এতে কারও হাত নেই।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন