বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ রকম ‘অস্বাভাবিক’ হারে ভোট পড়েছে পশ্চিম টেবিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মধ্য গজারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও। কেন্দ্র দুটিতে ভোট পড়েছে যথাক্রমে ৯৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ ও ৯৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

পোশাককর্মী উকিল মিয়া পশ্চিম টেবিরচর কেন্দ্রের ভোটার। তিনি সপরিবার গাজীপুরে থাকেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী ওই কেন্দ্রের ভোটার। কিন্তু তিনি ভোটের দিন গ্রামে যেতে পারেননি, ভোটও দেননি। উকিল মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফলাফল অনুযায়ী মৃত ও বিদেশে থাকা ব্যক্তিরাও ভোট দিয়েছেন। তাহলে কেমন ভোট হয়েছে, বুঝতে পারছেন!’

হাতপাখা প্রতীকের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. আনোয়ার হোসাইনের কেন্দ্র পশ্চিম টেবিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাঁর দাবি, তিনি নিজেও ভোট দিতে পারেননি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কেন্দ্রে গিয়ে দেখতে পাই, চেয়ারম্যান পদের সব ব্যালটে নৌকা প্রতীকের সিল মারা। পরে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে আমার ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে অনেক অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সব ব্যালটে নৌকায় সিল মারা থাকায় তিনি ব্যবস্থা করতে পারেননি। একপর্যায়ে নৌকার প্রার্থীর লোকজন আমাকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই প্রার্থী আমাকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে কিছুই বলেননি। চেয়ারম্যান পদের ব্যালটে নৌকা প্রতীকের সিল দেওয়া ছিল না।’

ইউনিয়নের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে আরও কিছু ‘অস্বাভাবিকতা’ দেখা যায়। পূর্ব টেবিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ১৬২ জন। সেখানে নৌকা পেয়েছে ২ হাজার ৫৮ ভোট। আনারস প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৮৩ ভোট। হাতপাখা প্রতীকে একটি ভোটও পড়েনি।

পশ্চিম টেবিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোট ২ হাজার ৮৩৯টি। সেখানে নৌকা পেয়েছে ২ হাজার ৭৯৯ ভোট। এই কেন্দ্রে আনারস একটি ভোটও পায়নি, আর হাতপাখা পেয়েছে ২ ভোট। হিসাব অনুযায়ী, এই কেন্দ্রে মাত্র ৩৮ জন ভোট দেননি। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, মৃত, প্রবাসী মিলিয়ে ভোটারদের মধ্যে অন্তত ৫০ জন ভোট দেননি।

মধ্য গজারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোট ২ হাজার ৩২৭টি। সেখানে নৌকা পেয়েছে ২ হাজার ২১৫ ভোট। আর আনারস পেয়েছে ৪ ভোট ও হাতপাখা ২৭ ভোট।

নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মো. শহিদুল্লাহ তাঁর নিজ এলাকার এই তিন কেন্দ্রে পেয়েছেন ৭ হাজার ৭২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. মমিনুল হক আনারস প্রতীকে পেয়েছেন মাত্র ৮৬ ভোট। আর মো. আনোয়ার হোসাইন হাতপাখা প্রতীকে ২৯ ভোট পেয়েছেন।

অথচ ওই তিন কেন্দ্র ছাড়া বাকি সাতটি কেন্দ্রে আনারস প্রতীকে বেশি ভোট পড়েছে। সাত কেন্দ্রে আনারস পেয়েছে ৮ হাজার ৪৪৭ ভোট। বিপরীতে নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ২ হাজার ২ ভোট। ওই সাত কেন্দ্রে ভোটের ব্যবধান ছিল ৬ হাজার ৪৪৫। কিন্তু ওই তিন কেন্দ্রের ‘অস্বাভাবিক’ ভোটে ফলাফলও উল্টে যায়। ৫৭০ ভোট বেশি পেয়ে জয়লাভ করেন নৌকার প্রার্থী।

ওই তিন কেন্দ্রে সাধারণ সদস্য পদে ১৩ জন প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৬ হাজার ২২৪ ভোট। আর সেখানে নৌকার প্রার্থী একাই পেয়েছেন ৭ হাজার ৭২ ভোট। অর্থাৎ ১৩ জন প্রার্থীর থেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ৮৪৮ ভোট বেশি পেয়েছেন।

ওই তিন কেন্দ্রে ভোটের এই চিত্রকে অস্বাভাবিক বলে দাবি করেছেন আনারস প্রতীকের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. মমিনুল হক। এ নিয়ে গত রোববার তিনি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছেন। ভোটের পরদিন ওই তিন কেন্দ্রে ভোট কারচুপি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি জামালপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি ওই তিন কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মমিনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ওই তিন কেন্দ্রে তাঁর এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সকালেই ব্যালটে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে রাখা হয়।

তবে নৌকার বিজয়ী প্রার্থী মো. শহিদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ওই তিন কেন্দ্রে কোনো কারচুপি হয়নি। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন। তাঁরা তো কোনো আপত্তি করেননি। সেখানে ভোট অস্বাভাবিক কেন হবে? গত জাতীয় নির্বাচনেও তো কোথাও কোথাও ৯৯ শতাংশ ভোট হয়েছিল। এখানে হলে সমস্যা কী।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তুলসীরচর ইউপি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা দিলরুবা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা কেন্দ্রের ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা সেই ফলাফল ঘোষণা করেন। কেন্দ্রে কী হয়েছে, সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেখবেন। নির্বাচনের সময় কেন্দ্রে কারচুপি বা অন্য কোনো অনিয়মের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব রিটার্নিং কর্মকর্তার নয়। তিনি বলেন, ওই প্রার্থী চাইলে নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারবেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন