‘সিনেমায় এমন দেখা যায়, বাস্তব জীবনেও এমন কিছু ঘটবে, তা কল্পনাও করিনি’

চার বছর পর কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে দেখা দুই বন্ধু মো. আবদুল্লাহ আল তামিম ও ফাহিম শারিয়ার সিজানের। সপ্তম শ্রেণিতে একসঙ্গে পড়ার পর দুজনের আর দেখা হয়নি। শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনায় এসে আবার দেখা দুই বন্ধুর। আজ শনিবার দুপুরেছবি: আবদুর রহমান

চার বছর আগে কুমিল্লার দেবীদ্বার সরকারি রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পাশাপাশি বসত মো. আবদুল্লাহ আল তামিম ও ফাহিম শারিয়ার সিজান। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তাদের বন্ধুত্ব। কিন্তু ফাহিমের বাবা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলামের বদলির কারণে সপ্তম শ্রেণিতেই দেবীদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা শহরে চলে যেতে হয় ফাহিমকে। এরপর আর দেখা হয়নি দুই বন্ধুর।

চার বছর পর আজ শনিবার কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল দুজনের। দুজনই এসেছে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের শিখো–প্রথম আলোর দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। পুরোনো বন্ধুকে সামনে দেখে প্রথমে যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না দুজনের। এরপর আলিঙ্গন, হাসি ও পুরোনো দিনের গল্পে ফিরে গেল দুই বন্ধু।

এরপরই জানা গেল আরও চমকপ্রদ খবর। চার বছর আগে যে বন্ধুত্ব বিচ্ছেদে থেমে গিয়েছিল, এবার তা যেন নতুন করে পথচলা শুরু করেছে। তামিম ও ফাহিম দুজনই ভর্তি হয়েছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল কলেজে। একই কলেজে ভর্তি হলেও এত দিন তাদের দেখা হয়নি।

ফাহিম এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা পুলিশ লাইনস স্কুল থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে। আর তামিম দেবীদ্বার সরকারি রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকেই জিপিএ–৫ পায়। তামিম বলল, ‘ফাহিম আর আমি প্রায় দুই বছর একসঙ্গে পড়েছি। ও আমার খুব ভালো বন্ধু। ও যখন দেবীদ্বার থেকে চলে যায়, তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল।’

পুরোনো বন্ধুকে ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত ফাহিম। সে বলল, ‘সিনেমায় অনেক সময় এমন দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনেও যে এমন কিছু ঘটবে, তা কল্পনাও করিনি। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, তামিম আর আমি এখন একই কলেজে ভর্তি হয়েছি। এবার নিশ্চয়ই আমাদের বন্ধুত্ব ও পথচলা দীর্ঘ হবে।’

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ক্রেস্ট হাতে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস
ছবি: প্রথম আলো

কৃতীদের মিলনমেলা

প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

এ সংবর্ধনার কুমিল্লা পর্ব আজ কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জেলার প্রায় ২ হাজার ৬০০ কৃতী শিক্ষার্থী এ অনুষ্ঠানের জন্য নিবন্ধন করে। তাদের সঙ্গে অনেক অভিভাবকও অংশ নেন।

সকাল আটটায় অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করে শিক্ষার্থীরা। কেউ এসেছে মা–বাবার সঙ্গে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে। নিবন্ধন বুথ থেকে ক্রেস্ট, খাবারসহ উপহারসামগ্রী সংগ্রহ করে তারা। এরপর প্রথম আলোর বিভিন্ন আয়োজন ও স্টল ঘুরে দেখে কৃতীরা। ছবি তোলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় সকাল থেকেই পুরো প্রাঙ্গণ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান। তিনি কৃতী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বক্তব্য পড়ে শোনান।

সেলফিতে সংবর্ধনার স্মৃতি ধারণ কয়েক বন্ধুর
ছবি: প্রথম আলো

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জিপিএ–৫ জীবনের সবকিছু নয়। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানবিকতাও ধরে রাখতে হবে।

কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হাসনাত আনোয়ার উদ্দীন আহমেদ বলেন, শুধু পরীক্ষায় নয়, আচরণ, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতায় জিপিএ–৫ পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মা–বাবার সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক রাখার পরামর্শও দেন তিনি।

সফল হতে হলে পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার জানতে হবে বলে মনে করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. শাহাদাৎ হোসেন। তিনি মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন।

কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ বলেন, জিপিএ–৫ পাওয়া আর ভালো মানুষ হওয়া এক বিষয় নয়। মেধাবী হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে হবে।

প্রথম আলোর ক্রীড়া সম্পাদক তারেক মাহমুদ এই জিলা স্কুলেরই শিক্ষার্থী। এখানকার স্মৃতি আর শিকড় এখনো তিনি আঁকড়ে রয়েছেন বলে জানান। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জিপিএ–৫ একটি মাইলফলক, সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি ধাপ। এখন তোমাদের সামনে কলেজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দুই বছর। এই সময় কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থবিদ্যাকে ‘না’ বলার শপথ পড়ান কুমিল্লা বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান কৃতী শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়
ছবি: প্রথম আলো

কৃতীদের মুখে মা–বাবার সংগ্রামের কথা

কুমিল্লার লালমাই উপজেলার মোহনপুর আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে আরিফ আকতাব। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট সে। বাবা তিতু মিয়া একজন প্রান্তিক কৃষক। মঞ্চে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বাবার সংগ্রামের কথাই বেশি বলল আরিফ। সে বলল, ‘আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। আমি ভালো মানুষ হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

লাকসামের আজগরা হাজী আলতাপ আলী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৫ পেয়েছে নাজিম উদ্দিন। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম কৃষক। অনুষ্ঠানে নাজিমের মা নাছিমা আক্তার ও বড় বোন ঝরনা আক্তার উপস্থিত ছিলেন। নাছিমা আক্তার বলেন, ছেলের এমন ফল ও এত বড় অনুষ্ঠানে আসতে পেরে তিনি আনন্দিত। ছেলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বাধা হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর চিন্তা রয়েছে। তিনি চান, ছেলে বড় চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করুক।

চৌদ্দগ্রামের মিয়ার বাজার তোষণ রফিক বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৫ পেয়েছে তাবাচ্ছুম আক্তার প্রমি। পারিবারিক জটিলতার কারণে ২০১৯ সাল থেকে তার বাবা ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ান। বর্তমানে মায়ের টিউশনির আয়ে দুই মেয়ের পড়াশোনা চলছে। প্রমি বলল, ‘আম্মা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। আমি বড় হয়ে চিকিৎসক হতে চাই। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

দাউদকান্দির নৈয়াইর ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে মারজান সুলতানা। তার বাবা মো. মিজানুর রহমান দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) কর্মরত। মারজানের সঙ্গে অনুষ্ঠানে এসেছেন বাবা, মা শাহনাজ আক্তার ও ছোট দুই বোন। মারজানের স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। তার মা নৈয়াইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি বলেন, এমন আয়োজন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে আরও বড় হওয়ার অনুপ্রেরণা দেবে। এ জন্য প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

দেবীদ্বারের আবদুর রহিম মুন্সী ও রূপালী বেগম দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে সবার ছোট জান্নাতুল মাওয়া। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে সে। অনুষ্ঠানে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী আবদুর রহিম মুন্সী।

অনেকে ব্যস্ত ছিল ফটো জোনে ছবি তোলায়
ছবি: প্রথম আলো

গান, নাচ ও কুইজে উৎসবমুখর পরিবেশ

অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে কুমিল্লা বন্ধুসভার সদস্য ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাত্রিকা ঘোষ (রূপকথা)। শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর মেন্টর দিবা চৌধুরী ও আদনান শাহেদ অর্ণব শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতার ১০ বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।

পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ কাউসার। ঢাকা থেকে আসা শিল্পীদের পরিবেশনায় গান ও নাচে মুখর হয়ে ওঠে সংবর্ধনাস্থল। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, ছবি তোলা ও আনন্দে দুপুর পর্যন্ত উৎসবের আমেজ ধরে রাখে কৃতী শিক্ষার্থীরা।

অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানান কুমিল্লা বন্ধুসভার সভাপতি প্রশান্ত কর্মকার ও সাধারণ সম্পাদক হানিফ মোসাব্বির।

অনুষ্ঠানের শেষে মায়ের সঙ্গে এসেছে রাফসান

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার কান্দুঘর বিনোদ বিহারী সেন উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে রাফসান আহমেদ। শিক্ষক মা রোজিনা আক্তারকে নিয়ে রাফসান ঢাকায় গিয়েছিল ভর্তি পরীক্ষা দিতে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সকাল সকাল ঢাকা থেকে তাঁরা রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু পথে যানজটসহ নানা ভোগান্তিতে পড়ে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান বেলা একটার দিকে। ততক্ষণে পুরো আয়োজনের সমাপ্তি ঘটেছে, বিদায় নিয়ে চলে গেছে কৃতীরা।

এরপরও জিলা স্কুল মাঠে আসতে পেরে কিছুটা হলেও তৃপ্ত রাফসান। একপর্যায়ে প্রথম আলো কুমিল্লার কার্যালয়ে আসেন রাফসান ও তার মা। তখন প্রথম আলোর কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান রাফসানকে বলেন, ‘মন খারাপ করার কিছু নেই, তোমাকে আমরা এইচএসসি পরীক্ষার পরে সংবর্ধনা দেব।’ এ কথা শুনতেই রাফসানের মলিন মুখে হাসি ফুটল।