‘হামেরা মরে গেলে এই এতিম ছুয়ালার কী হবে’

দাদা-দাদির স্নেহে বড় হচ্ছে মা–বাবা হারানো চার বছর বয়সী শিশু দীপু। গতকাল শনিবার দুপুরে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের হাতিডোবা-ছত্রশিকারপুর এলাকার দীপুদের বাড়িতে
ছবি: প্রথম আলো

‘নাতি তিনডা চোখের সামনোত এতিম হয় গেল। সবচেয়ে বড় চিন্তা ছোট্ট নাতিডাক নিয়া। এইলা (এসব) চিন্তা করিতে করিতে ওর দাদুর ব্রেন শর্ট (মানসিক সমস্যা) হইচে। উল্টাপাল্টা কথা কহেচে। হামারও (আমারও) তো বয়স হইচে। হামেরা (আমরা) দুইজন মরে গেলে এই এতিম ছুয়ালার কী হবে?’ ঠিক এক বছর আগে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার করতোয়া নদীতে নৌকাডুবিতে ছেলে ও পুত্রবধূকে হারানো বৃদ্ধা লক্ষ্মী রানী (৬২) এসব কথা বলেন।

লক্ষ্মী রানী পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের হাতিডোবা-ছত্রশিকারপুর এলাকার বাসিন্দা। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর করতোয়া নদীর আউলিয়ার ঘাটে ভয়াবহ নৌকাডুবিতে ছেলে ভূপেন্দ্রনাথ বর্মণ (৪০) ও পুত্রবধূ রূপালী রানীকে (৩৬) হারিয়েছেন তিনি। ভূপেন্দ্রনাথ বর্মণই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মানুষের বাড়িতে বাঁশের বেড়া তৈরির কাজ করে বৃদ্ধ মা–বাবা, স্ত্রী ও তিন ছেলেকে নিয়ে চলত তাঁর সংসার।

মহালয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর ভূপেন্দ্রনাথ বর্মণ ও রূপালী রানী তাঁদের তিন বছর বয়সী ছেলে দীপুকে সঙ্গে নিয়ে নদী পার হচ্ছিলেন। মাঝনদীতে নৌকাডুবিতে তলিয়ে যান তাঁরা। ঘটনার পর শিশু দীপু উদ্ধারকারীদের মাধ্যমে উদ্ধার হলেও নদীর গভীর পানিতে হারিয়ে যায় তার মা–বাবা। ঘটনার পরদিন মা রূপালী রানীর লাশ উদ্ধার হয়। এরপর ঘটনার দেড় মাসের মাথায় নৌকাডুবির স্থান থেকে প্রায় ৫০ গজ দক্ষিণে নদীর বালুর নিচ থেকে ভূপেন্দ্র নাথ বর্মণের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার হয়।
মারা যাওয়া ভূপেন্দ্রনাথ ও রূপালী রানী দম্পতির তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে দীপন চন্দ্র বর্মণ স্থানীয় একটি কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছে। মেজ ছেলে পরিতোষ চন্দ্র বর্মণ স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। আর ছোট ছেলে দীপুর বয়স এখন চার বছর।

আরও পড়ুন

গত শনিবার দুপুরে ভূপেন ও রূপালী দম্পতির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে ঝুম বৃষ্টি পড়ায় চার বছর বয়সী নাতি দীপুকে কোলে নিয়ে ঘরের বারান্দায় বসে আছেন লক্ষ্মী রানী। বাড়িতে মানুষের কণ্ঠ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন দীপুর দাদু মদন বর্মণ (৭০) ও বড় ভাই দীপন চন্দ্র বর্মণ (১৭)। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় মা–বাবা হারানো অবুঝ দীপু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে হাসছিল।

কিশোর দীপন চন্দ্র বর্মণ বলে, ‘নৌকাডুবির পরদিন মায়ের লাশ পেয়েছিলাম। কিন্তু দেড় মাস পর বাবার লাশ নদীর বালুর নিচ থেকে পাওয়া যায়। আমরা যেখানে বাড়ি করে আছি, এই ভিটামাটি আমাদের নিজের ছিল না। মা–বাবা মারা যাওয়ার পর অনুদানের যে টাকা পেয়েছিলাম, তার কিছু দিয়ে ভিটাবাড়িটা কিনে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছি। আর অল্প কিছু টাকা আছে। দেড় বিঘার মতো আবাদি জমি আছে। আমরা দুই ভাই পড়াশোনা করছি। দাদু মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ছোট ভাইটা (দীপু) দাদু-দাদির কাছেই মানুষ হচ্ছে বলে মা–বাবাকে খোঁজে না। জানি না আমাদের ভবিষ্যতে কী আছে।’

ছোট্ট দীপুকে দেখিয়ে দাদু মদন বর্মণ বলেন, ‘ছুয়ালার (ছেলেগুলোর) খোঁজ রাখেন। এতিমা ছুয়ালাক দেখিবার কেহ নাই।’

গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া বাজারের পাশে করতোয়া নদীর আউলিয়া ঘাট থেকে শতাধিক মানুষ নিয়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকা বড়শশী ইউনিয়নের বদেশ্বরী মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। যাত্রীদের অধিকাংশই বদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঘাট থেকে কিছু দূর যাওয়ার পর নৌকাটি ডুবে যায়। এতে ৭১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এখনো নিখোঁজ একজন।

আরও পড়ুন