জিপিএ-৫ না পেলে বিয়ে ঠেকানো যেত না ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তিথি মালির

শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অনুভূতি জানিয়ে বক্তব্য দেয় তিথি মালি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাটু মিলনায়তন, ৪ অক্টোবর ২০২৬ছবি: শহীদুল ইসলাম

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তিথি মালির বিয়ে ঠিক হয়েছিল। সে জিপিএ-৫ পেয়ে এবার এসএসসি পাস করেছে। খবর পেয়ে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশ পাওয়া তুরি জনগোষ্ঠীর কাজল পাড়ে তিথির বিয়ে দেওয়া বন্ধ করেন। বিয়ের জন্য সঞ্চিত টাকা খরচ করে মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে বাবাকে উদ্বুদ্ধ করেন। তিথিকে রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি করান।

উচ্চশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে আজ রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনায় তিথিকে নিয়ে আসেন কাজল পাড়ে। তিথি অনুষ্ঠানে বক্তব্যও দেয়। বলে, ‘আমি লেখাপড়া করে বড় হতে চাই। বাবা-মায়ের দুঃখ দূর করতে চাই।’

তিথি মালি জানত না প্রথম আলো-শিখোর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কথা। রেজিস্ট্রেশন করে যোগ দিতে হয়, এ কথাও জানত না সে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই কাজল পাড়ের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের শহীদ সাটু অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেয় এই কৃতী শিক্ষার্থী।

ফটো ফ্রেমে দল বেঁধে ছবি তুলছে বন্ধু, সহপাঠীরা
ছবি: প্রথম আলো

সংবর্ধনায় যোগ দিতে পেরে আপ্লুত তিথি প্রথম আলোকে বলে, ‘জীবনে কোনো দিন এমন বড় কোনো অনুষ্ঠানে আসার সুযোগ পাইনি। আর অনুষ্ঠানে কথা বলব, তা কখনো ভাবিনি। কথা বলার সময় খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এখন খুব ভালো লাগছে। দিনটি জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

কাজল পাড়ে জানান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ‘ভূঁইমালি’ সম্প্রদায়ের মধ্যে এসএসসিতে প্রথম জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী তিথি। নওগাঁর পোরশা উপজেলার ঘাটনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ–৫ পাওয়া একমাত্র শিক্ষার্থী সে। কাজলের এক বড় বোন তিথির গ্রাম পোরশা উপজেলার ঘাটনগর মালিপাড়া গ্রামের বউ। বোনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ওই গ্রামে গিয়ে তিথির বিয়ে দেওয়া বন্ধ করেন এবং মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে বাবাকে উদ্বুদ্ধ করেন।

জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান
ছবি: প্রথম আলো

কাজল পাড়ে বলেন, ‘তিথি এবার জিপিএ-৫ না পেলে এর মধ্যেই তার বিয়ে হয়ে যেত। আর জিপিএ-৫ না পেলে আমার বড় বোনও বিয়ে আটকানোর জন্য আমাকে এ খবর দিত না। তার বিয়ে আটকানোর জন্য শিক্ষানুরাগী আমার বড় বোনের ভূমিকা বড়।’

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেন কাজল পাড়ে। তিনি বলেন, ‘আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার এনায়েতপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমি এমন সংবর্ধনা পাওয়ার সুযোগ পাইনি। কিন্তু আজ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আমার খুব ভালো লাগছে।’

ক্রেস্ট হাতে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস
ছবি: প্রথম আলো

আনন্দ–উচ্ছ্বাসে একদিন

প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্ব।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

সকাল সাড়ে আটটা বাজতেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একে একে উপস্থিত হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। কেউ ফটো ফ্রেমে ছবি তুলতে ব্যস্ত, কেউবা ব্যানারের সামনে। কেউ এক্সপেরিয়েন্স জোনে গেম খেলে পুরস্কার জিততে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বেধেছে চারটি লাইনও।

ফটো ফ্রেমে সেলফি তুলছে শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সকাল ১০টায় শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। স্বাগত বক্তব্য দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আনোয়ার হোসেন। উদ্বোধনী নৃত্য নিয়ে আসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক রামিজ আহমেদ অন্তর ও তাঁর দল। কৃতী শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৃত্য পরিবেশন করে আফরিনা রহমান।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহিলা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বিপ্লব কুমার মজুমদার, নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রওশন আরা, রাজশাহীতে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননাপ্রাপ্ত আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন, কৃতী শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান, এ এইচ এম মাহিমুল আজম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার সহসভাপতি ফারাহ উলফাৎ রহমান অর্পিতা।

অনলাইনে অনুষ্ঠিত কুইজ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের অনুষ্ঠানে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন মহানন্দা সংগীত নিকেতনের শিল্পীরা। কৃতী শিক্ষার্থী নিক্সন হাসানও গান শোনায়।