কীটনাশকমুক্ত করতে কৃষকদের শপথ, গ্রামের জন উন্নয়ন কেন্দ্রকে ‘ফসলের হাসপাতাল’ ঘোষণা

গ্রামের প্রত্যেক কৃষক যেন কীটনাশকের ব্যবহার কমান, সেই লক্ষ্যে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো

ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের সাধুপাড়া গ্রাম। প্রত্যন্ত এই গ্রামের কৃষকেরা শপথ নিয়েছেন নিজেদের গ্রামকে কীটনাশকমুক্ত করতে। গ্রামের জন উন্নয়ন কেন্দ্রকে ‘ফসলের হাসপাতাল’ হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে। কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে ফসল উৎপাদনে উৎসাহী হচ্ছেন এই গ্রামের কৃষকেরা।

গত শুক্রবার সকালে মৃত্তিকা দিবস উপলক্ষে গ্রামের কৃষকেরা সাধুপাড়া কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত জন উন্নয়ন কেন্দ্রে আলোচনা সভা করেন। সেখানে তাঁরা কীটনাশকমুক্ত কৃষির জন্য গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। সেখানে তাঁরা জন উন্নয়ন কেন্দ্রকে ‘ফসলের হাসপাতাল’ ঘোষণা করেন। কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শোভাযাত্রা বের করা হয়। এ সময় কৃষকেরা ‘খাদ্যের থালায় বিষ কেন’, ‘মাটি, বায়ু, পানিদূষণ বন্ধ করো’, ‘বিপজ্জনক কীটনাশক নিষিদ্ধ করো’, ‘বিষমুক্ত জীবন চাই’, ‘জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করি, মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখি’, ‘জৈব কৃষি নিরাপদ খাদ্য’, ‘কীটনাশক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে’ প্রভৃতি লেখা ফেস্টুন তুলে ধরেন।

এর আগে কৃষকের উন্নয়নে পরিচালিত জন উন্নয়ন কেন্দ্রের কার্যালয়ে জৈব বালাইনাশকের উপকারিতা, তৈরি ও ব্যবহার নিয়ে কৃষকেরা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলের ১০ ধরনের মাটি প্রদর্শন করা হয় এবং এর গুণাগুণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয় কৃষকদের।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৯ সালে কৃষকের উন্নয়নের জন্য সাধুপাড়া কৃষক সংগঠনটি গঠিত হয়। গ্রামবাসীর সহায়তায় কৃষক আবদুল হেকিমের দেওয়া ৩ শতক জমিতে একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। কৃষক-জেলে, কামার-কুমার, কুটিরশিল্পী, শিক্ষার্থীসহ সব প্রান্তিক মানুষের জন্য কেন্দ্রটির নাম রাখা হয় জন উন্নয়ন কেন্দ্র। যদিও সাধারণ মানুষের মুখে এটি ‘কৃষক সমিতি’ নামেই পরিচিত। প্রতি মাসে এক দিন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাধুপাড়া গ্রামের ২৬ জন কৃষক এই সমিতির সদস্য।

এই কেন্দ্রে বিলুপ্ত প্রজাতিসহ মাঠে চাষ হওয়া ৭০ ধরনের ধান ও বিভিন্ন জাতের ২০ ধরনের সবজিবীজ কৌটায় ভরে দেয়ালে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ফসলের রোগবালাই মোকাবিলায় জৈব বালাইনাশক সম্পর্কেও একটি কর্নার রয়েছে। কৃষকেরা নিজেদের গ্রামকে কীটনাশকমুক্ত করতে জন উন্নয়ন কেন্দ্রটিকে ‘ফসলের হাসপাতাল’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ফসলে যত ধরনের রোগবালাই হয়, সেগুলো এখানে আনা হয় এবং জৈব উপায়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান থেকে ওষুধ তৈরি করে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সাধুপাড়া কৃষক সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ আবদুল বারী গ্রামবাসীকে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। তিনি তিন মাস আগে হর্টিকালচার সেন্টার থেকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন জৈব বালাইনাশক তৈরির ওপর। এখন নিজের অভিজ্ঞতা গ্রামের কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আবদুল বারী বলেন, ‘আমাদের সংগঠন কীটনাশকবিরোধী। আমরা এখন জৈব বালাইনাশকের ওপর বেশি জোর দিচ্ছি। কীটনাশক ব্যবহার করলেও তা ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা চলছে। প্রকৃতি থেকেই বিভিন্ন গাছ থেকে ওষুধ বানিয়ে ফসলের রোগবালাই দমন করছি। সবজিতে এগুলো বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বালাইনাশক বেশি ব্যবহার করলেও ফসলের ক্ষতি হয় না। কীটনাশক ব্যবহারে মানুষের রোগবালাই বাড়ছে। ফসলে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এটি ঘটছে। তাই আমরা বিষমুক্ত খাবার উৎপাদনে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করছি।’

২০০৯ সালে কৃষকের উন্নয়নের জন্য সাধুপাড়া কৃষক সংগঠন গঠিত হয়। নাম দেওয়া হয় জন উন্নয়ন কেন্দ্র। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

শুক্রবার সাধুপাড়া কৃষক সংগঠনের জন উন্নয়ন কেন্দ্রকে ‘ফসলের হাসপাতাল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেখানে একটি সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছে। সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে—‘প্রাকৃতিক উপায়ে ফসলের চিকিৎসা করা হয়। ফসলের হাসপাতাল। ব্যবস্থাপনায়: সাধুপাড়া কৃষক সংগঠন।’

সাধুপাড়া কৃষক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. নূরুল হক বলেন, কৃষকের এই হাসপাতালে ফসলের চিকিৎসা করা হয় প্রাকৃতিক উপায়ে। নিম, তুতিয়া, ভাটাপাতা, রসুনসহ নানা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে জৈব বালাইনাশক সবজিতে ব্যবহার শুরু হয়েছে।

সাধুপাড়া গ্রামের ভেতর দিয়ে চলা সড়কের দুপাশে অন্তত ৫০টি জামগাছ লাগানো হয়েছে। কৃষক আবুল কাশেম বলেন, ‘জামগাছ আমাদের বিভিন্নভাবে উপকার করছে। পাখি বাসা বানাবে, ফল খাবে এবং ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমন করবে। ফলে আমাদের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে না।’

কৃষকের এই উদ্যোগে সহায়তা করছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজ (বারসিক)। সংস্থার এলাকা সমন্বয়ক ওহিদুর রহমান বলেন, মাটির স্বাস্থ্য ভালো নেই। তাই কৃষকেরা গ্রামটিকে কীটনাশকমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে কৃষকেরা জমায়েত করে আলোচনা সভা, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করছে, যাতে গ্রামের প্রত্যেক কৃষক কীটনাশকের ব্যবহার কমায়।