ঘরের মধ্যে ঢোকার পর দেখা হয় জোছনা বেগমের ৮২ বছর বয়সী মা বিবি মরিয়মের সঙ্গে। চেয়ারে বসে ছিলেন তিনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, চোখে দেখেন না। মেয়ের কাছেই থাকেন তিনি। ঘূর্ণিঝড়ের রাতে প্রথমে তাঁকে নেওয়া হয় গ্রামের এক ব্যক্তির পাকা বাড়িতে। সেখান থেকে নেওয়া হয় স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে খোলা আশ্রয়কেন্দ্রে।

বিবি মরিয়ম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মা বিবি ছকিনার বাবার বাড়ি ছিল লালমোহন উপজেলার পশ্চিমচর উমেদ ইউনিয়নে। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের আগে বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন তাঁর মা। সেখানে জলোচ্ছ্বাসে অনেকের সঙ্গে ভেসে গিয়েছিলেন তিনি। আর ফেরেননি।

মায়ের নিখোঁজ হওয়ার সেই ঘটনার কথা মনে করে সিত্রাং ঘূর্ণিঝড়ের আগে মেয়ে জোছনাকে মরিয়ম বলেন তাঁকে আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে আসতে। কিন্তু তা অনেক দূরে। ঝড়বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কীভাবে যাবেন, সে চিন্তায় পড়েন জোছনা। পরে মাকে নিয়ে তোলেন একই গ্রামের বাসিন্দা কালাম মাঝির ঘরে। সেখান থেকে কালাম মাঝি তাঁকে একটি বিদ্যালয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান।

বিবি মরিয়মের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, তখন ওই বাড়িতে হাজির হন কালাম মাঝি (৫৪)। তিনি বলেন, ‘আল্লায় আমারে কুডেত্তেন এ্যান শক্তি দিছে। এক আতে (হাতে) আমনের মায় (মা), আরেক আতে পোলা-মাইয়া। বুকহমান পানি, ঘুটঘুইট্টা (ঘুটঘুটে অন্ধকার) রাইত। বৃষ্টি আর স্রোতের মাইদ্যেদি (মধ্য দিয়ে) ক্যামনে যে স্কুলের দোতলায় গি উইঠছি, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।’

কালাম মাঝি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে তাঁর বসতঘরের মালামাল, খাট, হাঁস-মুরগি সব ভেসে গেছে। সেসব কথা শুনে অশীতিপর বিবি মরিয়মের দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছিল। তিনি বলেন, ‘মাপ করি দিয়ো বাজান। তোমারে কষ্ট দিছি।’ জবাবে কালাম মাঝি বলেন, ‘কী গো কন খালাজি, আমনে আঁর লাই (আমার জন্য) দোয়া কইরেন। বেয়ানে (সকালে) খাইছেননি? লন, রুডি (রুটি) খান’ বলে একটি পাউরুটি মরিয়মের হাতে দেন। তখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ পরিবারের চুলোয় রান্না চড়েনি।