পাবনায় নারী উদ্যোক্তাদের ঘরের দোকান, ঈদের কেনাকাটায় স্বস্তি

ঘরেই চলছে পোশাক কেনাবেচা। বৃহস্পতিবার বিকেলে পাবনার বেড়া পৌর এলাকার মৈত্রবাঁধা মহল্লায়ছবি: প্রথম আলো

পবিত্র ঈদুল ফিতরের কয়েক দিন বাকি। ঈদ ঘিরে পাবনার বেড়া উপজেলায় জমে উঠেছে পোশাকের বাজার। তবে এখানে বাজারের বড় দোকানের পাশাপাশি ভিন্ন এক দৃশ্য চোখে পড়ছে। উপজেলার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নারী উদ্যোক্তারা নিজেদের ঘর বা বারান্দায় ছোট ছোট পোশাকের দোকান গড়ে তুলেছেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, বেড়া পৌর এলাকা ও আশপাশের গ্রামগুলোয় অর্ধশতাধিক বাড়িতে এ ধরনের দোকান রয়েছে। এসব দোকানের উদ্যোক্তা সবাই নারী, ক্রেতাও নারী। সংসারের কাজের ফাঁকে তাঁরা এক থেকে পাঁচ বছর ধরে পোশাক বিক্রির এই ছোট ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। ঈদ সামনে আসায় এখন এসব দোকানে ভিড় বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে দোকানগুলোয় পুরুষদের কেনাকাটার সুযোগ নেই। এতে নারীরা স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পারছেন।

ঘরেই ছোট দোকান

বেড়া পৌর এলাকার মৈত্রবাঁধা মহল্লার গৃহিণী শিপ্রা দাস পাঁচ বছর ধরে নিজের বাড়িতে কাপড়ের দোকান চালাচ্ছেন। তাঁর বাড়ির একটি ঘরেই সাজানো আছে শাড়ি, থ্রি-পিস, গাউন, বাচ্চাদের পোশাকসহ নানা ধরনের কাপড়।

শিপ্রা দাস বলেন, ‘বছর পাঁচেক আগে প্রায় ৪০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে বাড়িতে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন তা চার লাখ টাকার ওপরে দাঁড়িয়েছে। সংসার সামলে এই কাজ করতে খুব ভালো লাগে। ঈদে ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। ক্রেতাদের সবাই নারী।’

একই মহল্লার আরও কয়েকজন নারী বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা নিজেদের পরিচিত মহল ও এলাকার নারীদের ওপর নির্ভর করেই এই ব্যবসা চালাচ্ছেন। ফেসবুকেও অনেকে ছবি দিয়ে কাপড় বিক্রি করেন।

অল্প পুঁজিতে স্বাবলম্বী

বেড়া পৌর এলাকার শেখপাড়া মহল্লার বাসিন্দা রেখা খাতুন প্রায় দুই বছর ধরে বাড়িতে কাপড় বিক্রি করছেন। তাঁর দোকানটি বাড়ির বারান্দায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বছর দুয়েক হলো এলাকার অনেকের দেখাদেখি বাড়িতে অল্প-স্বল্প বিভিন্ন কাপড় এনে ব্যবসা শুরু করি। এখন ব্যবসা বেশ ভালো। নিজের কিছু আয় হচ্ছে। নিজেকে স্বাবলম্বী মনে হয়।’

রেখা খাতুনসহ আরও কয়েকজন বিক্রেতা জানান, বাড়িতে ব্যবসা হওয়ার কারণ হলো, তাঁদের দোকান ভাড়া দিতে হয় না। কর্মচারী রাখার প্রয়োজন নেই। বিদ্যুৎ বা অন্যান্য খরচও কম। এসব কারণে বাজারের দোকানের তুলনায় কম দামে কাপড় বিক্রি করতে পারেন। কম দামে ভালো কাপড় পেলে ক্রেতারাও খুশি হন। ঈদের সময় তো সারা দিনই বাড়িতে ক্রেতাদের ভিড় লেগে আছে।

শাহজাদপুর থেকে কাপড় সংগ্রহ

ঘরের দোকানগুলোর অধিকাংশ উদ্যোক্তা তাঁদের মালপত্র কিনে আনেন পাশের সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বিখ্যাত পাইকারি কাপড়ের হাট থেকে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের শাড়ি, থ্রি-পিস ও পোশাক পাইকারি দামে পাওয়া যায়।

শাহজাদপুরের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী মোরাজউদ্দিন বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ক্রেতারা এখানে কাপড় কিনতে আসেন। এখন আশপাশের উপজেলা থেকেও অনেক নারী নিজের বাড়িতে বিক্রির জন্য কাপড় কিনতে আসছেন।

স্বস্তিতে ঈদের কেনাকাটা

বাজারের ভিড় ও কোলাহল এড়িয়ে অনেক নারী এসব ঘরের দোকানে কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পোশাক কিনতে আসা বেড়া পৌর এলাকার মৈত্রবাঁধা মহল্লার বাসিন্দা শীলা আক্তার বলেন, বাজারে ঈদের সময় খুব ভিড় থাকে। সেখানে ঠিকভাবে কাপড় দেখাও যায় না। কিন্তু এখানে আরাম করে সময় নিয়ে কাপড় দেখা যায়, দরদামও করা যায়।

আরেক ক্রেতা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে অস্বস্তি লাগে। তাই প্রায়ই আমরা কয়েকজন মিলে বাড়ির দোকানগুলোয় ঘুরে ঘুরে কাপড় দেখি, কিনি।’

তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা

এসব ঘরের দোকানে শাড়ি, থ্রি-পিস, সালোয়ার-কামিজ, বাচ্চাদের পোশাক থেকে শুরু করে নারীদের নানা ধরনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়। তবে এর পাশাপাশি পুরুষদের টি–শার্ট, লুঙ্গিসহ কিছু পোশাকও পাওয়া যায়। পরিচিত পরিবেশে কেনাকাটার সুযোগ থাকায় ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।

মৈত্রবাঁধা মহিলা সমবায় সমিতির সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক শিখা রাহা বলেন, স্বল্প পুঁজি, ঘরের এক কোণ আর নিজের উদ্যোগ—এ তিনটিকেই পুঁজি করে এ এলাকার অনেক নারী এখন ছোট উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে স্থানীয় ঈদবাজারের চিত্র। এমন উদ্যোগ একদিকে যেমন নারীদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি ঈদের কেনাকাটায় নারীদের জন্য তৈরি করছে স্বস্তির পরিবেশ।