‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খাটো করে দেখার অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে’

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্ধুসভার আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আবুল কালাম চাষী। আজ দুপুরে চকরিয়া গ্রামার স্কুলেছবি: প্রথম আলো

‘নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খাটো করে দেখার অপচেষ্টা হচ্ছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা এখনো বেঁচে আছি। এ অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে। নতুন প্রজন্মকে বিকৃত বা নতুন করে বানানো কোনো ইতিহাস শেখানো উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।’

আজ শুক্রবার দুপুরে এক অলিম্পিয়াডে এ কথা বলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আবুল কালাম চাষী। কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার চকরিয়া গ্রামার স্কুলে এ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে প্রথম আলো বন্ধুসভা। এর শিরোনাম ছিল ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’। মোহাম্মদ আবুল কালাম চাষী এ অলিম্পিয়াডের প্রধান অতিথি ছিলেন।

‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে মার্চজুড়ে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করছে বন্ধুসভা।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম চাষী বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছি আমরা। তখন জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। আমাদের আবদুল হামিদসহ (চকরিয়ার বমু বিলছড়ির শহীদ আবদুল হামিদ) অনেকেই শহীদ হয়েছেন। অনেকেই আহত হয়েছেন। সেই ত্যাগের ইতিহাস মুছে ফেলা কী এত সহজ!’

প্রথম আলোর চকরিয়া বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক আরমান মুহাম্মদের সঞ্চালনায় অলিম্পিয়াডে আরও বক্তব্য দেন চকরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিৎ বড়ুয়া, চকরিয়া গ্রামার স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, ঘুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তূর্ণা নিশিতা বড়ুয়া ও প্রথম আলোর চকরিয়া প্রতিনিধি এস এম হানিফ।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্ধুসভার আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড কুইজে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। আজ বেলা ১১টায় চকরিয়া গ্রামার স্কুলে
ছবি: প্রথম আলো

এতে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো চকরিয়া বন্ধুসভার সভাপতি আবু তৈয়ব, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তাছিন রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরফাতুল ইসলাম ও পুষ্পিতা চৌধুরী, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক নাহিয়ান আল আমিন প্রমুখ।

চকরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিৎ বড়ুয়া বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মানে মুক্ত হওয়ার জন্য যুদ্ধ। কিসের কাছ থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষ—দাসত্ব ও শৃঙ্খল থেকে। দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন দেশে মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ পাওয়াই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সারমর্ম।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ইন্দ্রজিৎ বড়ুয়া বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা এই দেশ পেয়েছি। এটাকে মুক্তিযুদ্ধের ট্র্যাকে রাখা আমাদের পবিত্রতম দায়িত্ব। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব। মনে রাখতে হবে, অস্তিত্ব মুছে গেলে আর কিছুই বাকি থাকে না।’

গ্রামার স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সময়ে সময়ে ষড়যন্ত্র চলেছে। স্বাধীনের পর থেকে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সে সরকার তাদের মতো করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলার চেষ্টা করেছে। ৫৫ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে আমাদের কথা বলতে হচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ নয়।’

কুইজে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। আজ দুপুরে চকরিয়া গ্রামার স্কুলে
ছবি: প্রথম আলো

ঘুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তূর্ণা নিশিতা বড়ুয়া বলেন, শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই তার জন্মভূমি সৃষ্টির প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে, তখন তার মধ্যে দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষকদের উচিত স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস শিশুদের কাছে তুলে ধরা। শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করতে হলে সবার আগে তাদের শিকড়ের সন্ধানে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের অস্তিত্ব, বাঙালির গৌরবগাথা ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক এ অলিম্পিয়াডে মোট ৮১ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রাথমিক বাছাই শেষে পাঁচ শিক্ষার্থীকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের আবদুল্লাহ আল তাওসিফ, দ্বিতীয় চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের আলাউদ্দিন মোহাম্মদ আবিদ, তৃতীয় চকরিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মো. মাহিদুল ইসলাম, চতুর্থ চকরিয়া গ্রামার স্কুলের ইরেশ মঈন ও পঞ্চম চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের আদিত্য বড়ুয়া। কুইজ প্রতিযোগিতায় সাতটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ নেয়।

প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বই উপহার দেওয়া হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। আয়োজনটির সহযোগিতায় ছিলেন প্রথম আলো চকরিয়া বন্ধুসভার সদস্যরা।