সম্প্রতি আরাফাতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পাড়ার অন্য ছেলেদের সঙ্গে সে খেলা করছে। জিজ্ঞাসা করতেই সে বলে, বিদ্যালয় ছুটির পর বাড়িতে এসে খাওয়া-দাওয়ার পর একটু খেলা করতে বেরিয়েছে। সন্ধ্যা হলে নিজের পড়ার টেবিলে পড়তে বসবে। নিজের সব কাজ নিজেই করতে পারে সে। মা সেলিনা খাতুন তার (আরাফাত) হাতের কথা ভেবে মাঝেমধ্যে মুখে খাবার তুলে খাইয়ে দেন। তবে বেশির ভাগ সময় সে নিজেই দুই হাতের মাঝে চামচ রেখে খাবার খায়।

আরাফাতের বাবা আল আমিন মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, ছেলেটি জন্ম থেকেই এমন। ছোট থেকে তার মা অনেক যত্ন করে বড় করেছেন। এখন সে নিজেই নিজের কাজ করতে পারে। ছোট থেকে ছেলের পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ। পড়ার প্রতি ঝোঁক থাকায় তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয়। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব ক্লাসে সে প্রথম হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সে অত্যন্ত নম্র-ভদ্র ছেলে। খুবই আদর্শবান হয়ে গড়ে উঠছে। এবার সে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছে। সারাক্ষণ বলছে, “আব্বু আমি ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পাব।”’

আল আমিন মল্লিক আরও বলেন, সামান্য কিছু কৃষিজমি আছে, সেখানে চাষাবাদ করে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে ছেলের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ছেলের হাতের অর্ধেক না থাকায় চেয়ার-টেবিলে বসে লিখতে পারে না। সব জায়গায় তাকে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে লিখতে হয়। তারপরও ঠিক সময়ের মধ্যে পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর লিখে ফেলে। ছেলের ইচ্ছায় কোটচাঁদপুর শহরের ভালো বিদ্যালয়ে তাকে ভর্তি করেছেন। শিক্ষকেরা একটু সহযোগিতা করলে আরাফাত ভালো করবে তাঁর বিশ্বাস।

আরাফাতের মা সেলিনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, জন্মের পর থেকে ছেলের এ অবস্থায় তাঁরা কখনো হতাশ হননি। ছেলের পড়ালেখার আগ্রহ দেখে আরও খুশি হয়েছেন। নিজের মতো করে যত্ন-ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তুলছেন। এখন ছেলে নিজের সব কাজ নিজেই করতে শিখছে। তাঁদের আশা, ছেলের ইচ্ছেমতো পড়ালেখা করাবেন।

দক্ষিণ বলুহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের পাঠ চুকিয়েছে আরাফাত। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ছেলেটি সব শ্রেণিতে প্রথম হয়েছে। এবারও প্রথম হয়ে মাধ্যমিকে চলে গেল। সে খুবই ভালো ছেলে। কখনো খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মেশে না। পড়ার প্রতি তার ব্যাপক আগ্রহ। সবাই সহযোগিতা করলে সে অনেক দূর যাবে।

বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোটচাঁদপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মফিজুর রহমান বলেন, ছেলেটি ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন ভর্তি হয়েছে। কষ্ট করে লেখার কাজটি করে। সবার সহযোগিতায় সে এগিয়ে যাবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান মাসুম বিল্লাহ বলেন, ছেলেটি ভর্তির বিষয়ে তাঁর কাছে এসেছিল। তিনি সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি কিছু শিক্ষা উপকরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তার পাশে থাকতে পেরে আমার ভালো লাগছে। যত দিন সম্ভব হবে শিশুটির পাশে থাকব।’