কালিয়াকৈর উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর সকাল আনুমানিক ৯টায় উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের সাকাশ্বর বাজারের দক্ষিণ–পূর্ব পাশের তুরাগ নদে পাকিস্তানি  একটি  যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার আগেই বৈমানিক প্যারাসুট নিয়ে পাশের বেগমপুর গ্রামের অদূরে নদীর পশ্চিম পাশে অবতরণ করেন। তাৎক্ষণিক মুক্তিযোদ্ধা সেকশন কমান্ডার সামছুল হক গ্রুপের সদস্যরা ওই পাইলটকে আক্রমণ করে আটক করে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে হস্তান্তর করেন। পাইলটকে আটক করে মুক্তিযোদ্ধারা স্থান পরিবর্তন করার পরেই হেলিকপ্টার নিয়ে ঘটনাস্থলে আসে পাকিস্তানি বাহিনী। ওই পাইলটকে উদ্ধারে গ্রামটিতে অভিযান চালায় তারা।

উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা জানান, পাইলটকে দীর্ঘক্ষণ খোঁজার পর না পেয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। পরে বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা জল ও স্থলপথে সাকাশ্বর আসে এবং সাকাশ্বর গ্রামসহ অন্যান্য গ্রামে আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানি সেনাদের এলোপাতাড়ি গুলির শব্দে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। গ্রামবাসী জীবন বাঁচাতে পালাতে থাকেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে ওই এলাকার জানেস আলী, আবদুল গফুর মুন্সিসহ অনেকে শহিদ হন।

মুক্তিযুদ্ধের সেই স্মৃতি ধরে রাখতে সাকাশ্বর বাজার এলাকায় তুরাগ নদের খেয়াঘাটের পাশে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ৫২৫ টাকা ব্যয়ে সাকাশ্বর মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ ও সংরক্ষণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। ওই নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারি। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা ব্যয় বেড়ে জাদুঘরটির নির্মাণ খরচ দাঁড়ায় ৬২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ওই অর্থ বরাদ্দ দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এটি নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। বাস্তবায়নে ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। জাদুঘরটি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

অর্ধকোটির বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জাদুঘরটি যেন দেখভালের কেউ নেই। কালিয়াকৈর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, জাদুঘরটিতে বইসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত নানান জিনিস রাখার কথা ছিল। কিছু বইও আছে। একজন লোকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর পর কিছু করা হয়নি।

সম্প্রতি এক সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, কেউ না থাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা সেখানে বসে থাকার পর কোথা থেকে যেন হাজির হলেন জাদুঘরটির দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সুরুজ আলী। গেটের তালা খুলে দেওয়ার পর ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, ভেতরে বড় একটি টেবিল ও কিছু চেয়ার রয়েছে। বইয়ের শেলফ রয়েছে কয়েকটি, সেখানে বই আছে মাত্র ১০৭ খানা। সেগুলোর ওপরে ধুলাবালু জমেছে। দেখেই বোঝা যায়, এসব বই পরিষ্কার করা হয়নি দীর্ঘদিন ধরে। মেঝেতে এলোমেলো বিছানাপত্র, জানালায় শুকাতে দেওয়া হয়েছে গামছা, লুঙ্গি।

জাদুঘরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয় কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাজেট পেলেই নতুন বই কেনা হবে এবং স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ শুরু করা হবে।