গ্যাসের অপেক্ষায় কেটে গেছে পুরো সকাল থেকে দুপুর
সকালে চুলায় ভাত বসানোর কথা ছিল। মাছ কেটে ধুয়ে রাখা, ডাল বাছাই করা—সব প্রস্তুতিও ছিল। কিন্তু সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ করেই নিভে যায় গ্যাসের চুলা। প্রথমে ভেবেছিলেন, কয়েক মিনিট পরই হয়তো গ্যাস চলে আসবে। কিন্তু এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষাও দীর্ঘ হতে থাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও চুলায় আগুন জ্বলেনি।
গতকাল রোববার চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদের হাজিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আমেনা বেগমের সময় কেটেছে এভাবেই। অবশেষে গতকাল বেলা তিনটার দিকে গ্যাস এলেও চাপ এত কম ছিল যে সঙ্গে সঙ্গে রান্না শুরু করা যায়নি। বিকেলের দিকে কোনোরকমে রান্না শেষ করে পরিবারের সদস্যরা দুপুরের খাবার খেয়েছেন।
৫৫ বছর বয়সী আমেনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দীর্ঘ সময় গ্যাস থাকবে না, সেটা জানলে অন্তত সকালে রান্না করে রাখতাম। কেউ না খেয়ে ছিল, কেউ বাইরে থেকে খাবার কিনে এনেছে। সকাল থেকে সবাই শুধু অপেক্ষা করেছে কখন গ্যাস আসবে।’
শিশুদের জন্য পানি ফোটাতে পারিনি। সময়মতো খাবারও তৈরি করতে পারিনি। গ্যাস চলে যাবে, আগে থেকে জানলে কিছু প্রস্তুতি নেওয়া যেত। হঠাৎ করে সবকিছু ওলট–পালট হয়ে গেছে।রোকেয়া আক্তার, বাসিন্দা, আগ্রাবাদ।
আমেনা বেগম যে চারতলা ভবনে থাকেন, সেখানে ২৪টি পরিবারে বসবাস করেন ৭০ থেকে ৮০ জন মানুষ। গ্যাস না থাকায় ভবনজুড়েই ছিল একই দৃশ্য। কেউ হোটেল থেকে খাবার কিনে এনেছেন, কেউ দুপুরের খাবারই খাননি। অনেকে অপেক্ষা করেছেন, যদি গ্যাস আসে।
শুধু একটি ভবন নয়, হাজিপাড়া ও আশপাশের এলাকায় গতকাল এমন চিত্র ছিল অনেক বাসায়। রান্নাঘরের চুলা নিভে থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে থাকা পরিবারগুলো।
আগ্রাবাদের আরেক বাসিন্দা রোকেয়া আক্তারের (৬০) বাড়িতেও সকাল থেকে গ্যাস ছিল না। তাঁর পরিবারে দুটি ছোট শিশু রয়েছে। তিনি বলেন, ‘শিশুদের জন্য পানি ফোটাতে পারিনি। সময়মতো খাবারও তৈরি করতে পারিনি। গ্যাস চলে যাবে, আগে থেকে জানলে কিছু প্রস্তুতি নেওয়া যেত। হঠাৎ করে সবকিছু ওলট–পালট হয়ে গেছে।’
এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শিল্প ও শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা (ক্যাপটিভ পাওয়ার) খাতে গ্যাসের চাপ কমানোর পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও সরবরাহে প্রভাব পড়ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাপ কম থাকার সমস্যা নতুন নয়। তবে গত মঙ্গলবার মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আগে যেখানে কম চাপের মধ্যেও কোনো না কোনোভাবে রান্না করা যেত, এখন দিনের পর দিন কয়েক ঘণ্টা করে গ্যাস একেবারেই থাকছে না।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শিল্প ও শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা (ক্যাপটিভ পাওয়ার) খাতে গ্যাসের চাপ কমানোর পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও সরবরাহে প্রভাব পড়ছে।
কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস এসেছে ২৩ কোটি ঘনফুট। আগের দিন সরবরাহ পাওয়া গেছে ২২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। অথচ একই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার মাত্র প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। এই ঘাটতির প্রভাবই এখন সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন নগরের সাধারণ মানুষ।
নগরের বাসিন্দারা বলছেন, সকালের নাশতা থেকে দুপুরের খাবার—একটি পরিবারের প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকটাই নির্ভর করে রান্নাঘরের আগুনের ওপর। সেই আগুনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বলছে না। এতে গ্যাস-সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।
দুপুরের খাবার বিকেলে
হালিশহর ঈদগাহ রঙ্গিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনজুমান আরা। গতকাল তাঁর পরিবারের দুপুরের খাবার খেতে খেতে বিকেল গড়িয়ে যায়। সকাল থেকেই চুলা মিটমিট করে জ্বলছিল। বেলা ১১টার দিকে গ্যাস একেবারে চলে যায়। এরপর প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চুলা ছিল নিভে। বেলা সাড়ে তিনটার পর গ্যাস আসে। তখন রান্না বসান। দুপুরের খাবার খেতে খেতে বিকেল সাড়ে চারটা বেজে যায়। আনজুমান আরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাস আসার পর রান্না বসাতে হয়েছে। দুপুরের খাবার খেতে খেতে বিকেল হয়ে গেছে। খুব দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এভাবে আর কয় দিন চলবে জানি না। কেজিডিসিএলও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি।’
একই অভিজ্ঞতা শাকিল আহেমদের পরিবারেরও। তিনি থাকেন নগরের খাজা রোডে শাহ ওয়ালীউল্লাহ আবাসিক এলাকায়। শাকিল জানান, গতকাল সকাল থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত গ্যাস ছিল না। তাঁরাও দুপুরের খাবার খেয়েছেন বিকেলে।
গ্যাসের এই সংকট কবে কাটবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। মহেশখালীর দুটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের কার্যক্রম পরিচালনা করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এই কোম্পানির এলএনজি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, মার্কিন এক্সিলারেট এলএনজি টার্মিনাল চালু করার জন্য বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল কাজ করছে। যেকোনো সময় সমস্যার সমাধান হবে। এরপর পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।