শরিফের ‘ওল্ড কালেকশন’–এ ৫০০ বছরের পুরোনো পুঁথিসহ দুর্লভ বইপত্র, এক পত্রিকা বিক্রি ৬০ হাজার টাকায়
৫০০ বছরের পুরোনো হস্তলিখিত তুলট কাগজের পুঁথি, আর ১৮৫১ সালে রচিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কালজয়ী শিশুশিক্ষা গ্রন্থ ‘বোধোদয়’। আছে শিশুদের শতাব্দীপ্রাচীন পাঠ্যবই ‘আমার সাথী’ আর পাঁচ আনা মূল্যের দুষ্প্রাপ্য বাংলা পাঠ্যবই ‘মুক্তাহার’-এর মতো বইও। শুধু তা–ই নয়, সংগ্রহে আছে ১৩৫৫ সালে প্রকাশিত পাঁচ সিকা মূল্যের কাব্য সাহিত্য ‘জয়গান’।
শরিফুল ইসলামের ব্যক্তিগত এমন সংগ্রহ আগ্রহী পাঠকের নজর কাড়বে। দুষ্প্রাপ্য অসংখ্য বইয়ের পাশাপাশি সত্তরের দশকের পত্রিকা-ম্যাগাজিন ও ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ের টিকিটসহ নানা দুর্লভ জিনিসপত্রও স্থান পেয়েছে তাঁর সংগ্রহশালায়।
শরিফের ব্যক্তি উদ্যোগে গড়া এ সংগ্রহশালা কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিম হারুয়া এলাকার কসাইখানা সড়কের পাশে অবস্থিত। স্থানীয় লোকজন চেনেন ‘পুরোনো বুকশপ’ নামে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে পরিচিত ‘ওল্ড কালেকশন’ হিসেবে। নিজের ভাড়া বাসার কাছে মাঝারি আকারের একটি দোকানঘরে এই সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন শরিফ।
গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শরিফের পুরোনো বুকশপে ঢুকতেই চোখে পড়ে শেলফে সাজানো পুরোনো সব বই–পুস্তক আর পত্রিকা। অচেনা মলাট আর অনেক ছেঁড়া বই দেখেই বুঝা যায়, এগুলো পুরোনো সংগ্রহ। ইতিহাসের সাক্ষী ৬০-৭০ বছরের পুরোনো কিছু পত্রিকা বাঁধাই করে দেয়ালে টানিয়ে রেখেছেন শরিফ।
যেভাবে সংগ্রাহক হয়ে ওঠেন
শরিফুল ইসলামের বয়স ৩৮ বছর। তিনি নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলার কাশিমপুর এলাকার বাসিন্দা। তবে ১২ বছর ধরে তিনি কিশোরগঞ্জের পশ্চিম হারুয়া এলাকায় বসবাস করে কাগজ কেনাবেচার ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বিয়েও করেছেন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে। স্ত্রী জেসমিন আক্তার একজন গৃহিণী। পুরোনো বই-পুস্তক আর দুর্লভ জিনিসপত্র সংগ্রহে স্ত্রীও তাঁকে উৎসাহ দিয়ে আসছেন। তাঁদের লাবিবা আক্তার ও জায়েন জিসান নামের দুটি সন্তান রয়েছে।
দুষ্প্রাপ্য বইপত্র আর পুরোনো জিনিস সংগ্রহে আগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে শরিফ প্রথম আলোকে বলেন, শ্বশুরবাড়ি কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে হওয়ার কারণে সেখানে বেশ কিছুদিন বসবাস করার সুযোগ হয় তাঁর। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে তিনি হাওরাঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু দোকানে একটি বিষয় লক্ষ করেন। ৪০-৫০ বছর আগের নিউজ প্রিন্টের পুরোনো পত্রিকা-ম্যাগাজিন একটু বেশি দামে বিক্রি করছেন কিছু দোকানি।
শরিফ বলেন, এটা দেখে তিনি একটু অবাক হন। তখন কৌতূহলবশত জানার চেষ্টা করেন, এগুলো যাঁরা কেনেন, সেগুলো দিয়ে তাঁরা কী করেন? খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এই কাগজগুলো তাঁরা হাতে কেটে টুকরা টুকরা করে বিড়ি তৈরি করে হাওরাঞ্চলের কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষদের কাছে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, এসব বইপত্র ও পত্রিকায় ইতিহাসের অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। অথচ সেগুলোকে কেটে টুকরা করে বিড়ি বানিয়ে ধূমপানের প্রসার ঘটানো হচ্ছে।
শরিফ বলেন, ‘তাৎক্ষণিক আমার মাথায় আসে—আমি ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির এমন স্মৃতি এভাবে ধ্বংস করতে দেব না। আমি এগুলো সংগ্রহ করব। সেই ভাবনা থেকে আমি নেমে পড়লাম ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী পুরোনো সেসব বইপত্র ও পত্রিকা সংগ্রহ করার কাজে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেই থেকেই দুর্লভ-দুষ্প্রাপ্য বইপত্রের পাশাপাশি প্রাচীন জিনিসপত্র সংগ্রহ করার আগ্রহ তৈরি হয় আমার। তখন থেকে যখন যেখানে যা পেয়েছি, তাই সংগ্রহ করে রাখার চেষ্টা করেছি।’
পুরোনো বুকশপের কিছুটা দূরেই রয়েছে একটি বড়সড় গুদামঘর। সারা দেশ থেকে পুরোনো সব বই-পুস্তক প্রথমে গুদামঘরে এনে রাখেন শরিফ। তারপর সেখান থেকে জহুরির মতো মণি-মুক্তা খুঁজে বাছাই করে পুরোনো বুকশপ তথা সংগ্রহশালায় রাখেন।
এই সংগ্রাহক বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকার অনেক লোক নিজ উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী মূল্যবান বইসহ নানা জিনিসপত্রের জন্য আমাকে খবর দেন। সারা দেশ থেকে আমি দুষ্প্রাপ্য বইপত্র আর জিনিসপত্র সংগ্রহ করি।’
শরিফ বলেন, ‘দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অনেক মানুষ আমার কাছ থেকে এসব জিনিসপত্র কেনেন। অনেকে আমার ফেসবুক পেজ থেকেও অনলাইনে জিনিসপত্র সংগ্রহ করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সংগ্রহশালার জন্য আমি আমার জীবনের শ্রম-ঘাম উৎসর্গ করে যাচ্ছি। তবে এই ভেবে ভালো লাগে যে এই সংগ্রহশালা থেকে অনেকে উপকৃত হচ্ছেন।’
এক পত্রিকা ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি
ফেসবুকে ‘ওল্ড কালেকশন’ নামে শরিফের একটি পেজ আছে। সেখানে দুষ্প্রাপ্য বইসহ দুর্লভ নানা জিনিসপত্রের ছবি দেন তিনি। এখান থেকে দেখে অনেকে সেগুলো কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। যে জিনিস দুটি বা বেশি থাকে, একটি রেখে সেগুলো বিক্রি করে দেন।
দুর্লভ কিছু বই অনেক বেশি দামে কিনতে চাইলেও শরিফ বিক্রি করতে চান না। তবে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ পত্রিকার একটি সংস্করণ এক প্রবাসী লেখকের কাছে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এই পত্রিকাটি ‘দৈনিক পাকিস্তান’ নামে প্রকাশিত হতো। এ ছাড়া ১৯৭০ সালে রচিত গোয়েন্দা উপন্যাস ‘দুষ্টগ্রহ’ নামে একটি বই এক অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসীর কাছে ৪০ হাজার টাকায় তিনি বিক্রি করেন।
আছে পাম্প লাইট, পুরোনো টেলিফোন সেট
৬০ থেকে ৭০ হাজার পুরোনো বইপত্র সংগ্রহ করেছেন শরিফ। রয়েছে বহু বছর আগে হাতে লেখা বিভিন্নজনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ও সাড়াজাগানো চিঠিও।
বইপত্র ও পত্রিকা-ম্যাগাজিন ছাড়াও আরও নানা পুরোনো জিনিসপত্র রয়েছে শরিফের সংগ্রহে। ঘরে ঢুকতেই বাঁ পাশের শেলফে সাজানো পুরোনো কম্পিউটার, টেপ রেকর্ডার, পাম্প লাইট, ব্রিটিশ আমলের ট্রাংক, পুরোনো থালাবাসন, ক্যাসেট প্লেয়ার, টেলিফোন সেট ও পুরোনো সেই সাদাকালো টেলিভিশন। এ ছাড়া রয়েছে পুরোনো অনেক ধাতব মুদ্রা।
পুরোনো বুকশফে ধুলাজমা বই দেখছিলেন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে পড়া মোজাহিদুল ইসলাম। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। গড়ে তুলেছেন ‘কিশোরগঞ্জ ভলান্টিয়ার্স’ নামের স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠন।
মোজাহিদ বললেন, সময়-সুযোগ পেলেই তিনি শরিফুল ইসলামের পুরোনো বুকশপে চলে আসেন। ধুলাবালু জমা এ দোকানেও পাওয়া যেতে পারে মূল্যবান বইপত্রের সন্ধান। সে আশায় ধুলার আস্তরণ মুছে বইপত্র খুঁজে দেখছেন তিনি।
এই শিক্ষার্থী বলেন, শরিফুল ইসলামের ছোট্ট দোকানটিতে আছে অসংখ্য মূল্যবান পুরোনো বইপত্র ও পত্রিকা। এসব বইপত্র ও পত্রিকা ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের দলিল ও সাক্ষী। অতীতে কোন সময় কী ঘটেছিল, তার সঠিক ইতিহাস জানতে গবেষক, লেখক, কবি-সাহিত্যিকসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংগ্রাহকেরা শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অনেকে দেশের বাইরে থেকেও অনলাইনে বই সংগ্রহ করেন।
মোজাহিদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এখানে আসা-যাওয়ায় বুঝতে পারলাম, শরিফুল ইসলাম অনেকটা আর্থিক কষ্টে আছেন। দোকানটি রাস্তার পাশে হওয়ায় ধুলাবালুর যন্ত্রণায় ভুগছেন। এ ছাড়া তাঁর সংগ্রহ করা মূল্যবান জিনিসপত্র ঠিকমতো সংরক্ষণ করতে পারছেন না। শেলফে কাচের ব্যবস্থা করতে পারলে সেগুলো আরও সুরক্ষিত থাকত। সরকারসহ সমাজের বিত্তশালীরা সংগ্রহশালাটিকে সমৃদ্ধ করতে এগিয়ে আসবেন, এমন প্রত্যাশা এই শিক্ষার্থীর।’