‘বন্যায় ফসল তো সব নষ্ট হয়ে গেছে, ধারদেনার টাকা কীভাবে শোধ করব’

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সবজির খেত। বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের তালুকদারপাড়া এলাকায়। গত শনিবার তোলাছবি: মং হাই সিং মারমা

প্রতিবেশীর কাছ থেকে ৮ হাজার টাকায় ৪০ শতক জমি ইজারা নিয়ে করলা চাষ করেছিলেন ইয়াসমিন আক্তার (৩৫)। এরপর রক্ষণাবেক্ষণে আরও খরচ করেন ৩০ হাজার টাকা। ফলনও হয়েছিল ভালো। সব মিলিয়ে দুই লাখ টাকার করলা বিক্রির আশা ছিল তাঁর। তবে তাঁর এ আশা পূরণ হয়নি। বন্যায় তাঁর খেতের সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।

ইয়াসমিন আক্তার বান্দরবান সদর উপজেলার রেইছা সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গোয়ালিয়াখোলার মনিরাপাড়ার বাসিন্দা। এলাকাটি বান্দরবানের সবজি উৎপাদনের অন্যতম ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। ইয়াসমিনের করলাখেত তাঁর বাড়ির পাশেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জেলার ৭টি উপজেলায় ৮ হাজার ১৬৯টি কৃষক পরিবারের ৫ হাজার ৭৩৬ একর ফসলি জমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৩৭ একর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে এ খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

গত শুক্রবার দুপুরে কথা হয় ইয়াসমিনের সঙ্গে। তখন তিনি জমির পাশেই বসে ছিলেন। ইয়াসমিন আক্তার জানান, টানা চার দিন তাঁর খেত পানিতে ডুবে ছিল। পানি নেমে যাওয়ার পর দেখেন, সব করলাগাছই পচে গেছে। হতাশা নিয়ে ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘বন্যায় ফসল তো সব নষ্ট হয়ে গেছে, এখন ধারদেনার ৩০ হাজার টাকা কীভাবে শোধ করব, খাবই-বা কী, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

শুধু ইয়াসমিন নন; সরেজমিনে গোয়ালিয়াখোলা ও রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গত সপ্তাহে সৃষ্ট বন্যার পানিতে স্থানীয় অনেক কৃষকেরই ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি কমে যাওয়ায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হচ্ছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দেখা গেছে, খেতে পচে পড়ে রয়েছে সবজি। কৃষকেরা এসব জমি পরিষ্কার করার কাজ করছেন।

গোয়ালিয়াখোলার মনিরাপাড়ার কৃষক মো. রুবেল জানান, বন্যায় তাঁর ফসলের পাশাপাশি ঘরও ভেসে গেছে। পরিবার নিয়ে তিনি এখন আত্মীয়ের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একই গ্রামের রওশন আরা ও জেসমিন আক্তারের ফসলের জমিও রক্ষা পায়নি। জানতে চাইলে জেসমিন বলেন, প্রায় ৬০ শতক জমিতে করলা, ঢ্যাঁড়স ও বরবটি চাষ করেছিলেন। কিছুদিন পর থেকে ফলন হতো। তিন দিন পানিতে ডুবে থাকায় পুরো খেত নষ্ট হয়ে গেছে।

বন্যার পানিতে ডুবে আছে সবজিখেত। ১২ জুলাই সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের জিনিঅং পাড়া এলাকায়
ছবি: মং হাই সিং মারমা

গোয়ালিয়াখোলা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনছুর আলী প্রথম আলোকে বলেন, বন্যায় তাঁর ব্লকে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৭০টি কৃষক পরিবার। এর মধ্যে প্রায় ১৫০টি কৃষক পরিবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাঁদের অধিকাংশই প্রান্তিক কৃষক, যারা অন্যের কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেন। ভাঙ্গামুরা, চেমিমুখসহ বিভিন্ন এলাকায় শুধু তাঁর ব্লকেই প্রায় এক কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জেলার ৭টি উপজেলায় ৮ হাজার ১৬৯টি কৃষক পরিবারের ৫ হাজার ৭৩৬ একর ফসলি জমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৩৭ একর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে এ খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় ৮ হাজার ১৬৯টি কৃষক পরিবারের ৫ হাজার ৭৩৬ একর ফসলি জমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৩৭ একর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে এ খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বান্দরবান সদর উপজেলা। এখানে দুই হাজার ৬০৪টি কৃষক পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া লামায় ১ হাজার ৮৭২টি, রোয়াংছড়িতে ১ হাজার ২৬৮টি, থানচিতে ১ হাজার ২৮টি, নাইক্ষ্যংছড়িতে ৫৬১টি, আলীকদমে ৬৩৫টি ও রুমায় ২০১টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দিন বলেন, বন্যা ও পাহাড়ধসে আমনের বীজতলা, আউশের জুমচাষ, ফলের বাগান, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি, আদা ও হলুদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, বন্যার পলি জমিতে উর্বরতা বাড়ায়। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে কৃষকেরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।