আমি মাজারে যাব নাকি অন্য কোথাও, এটা আমার গণতান্ত্রিক অধিকার: ফরহাদ মজহার
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘আমি মাজারে যাব নাকি অন্য কোথাও, এটা আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। মাজার ভাঙা ইসলামের চিন্তার মধ্যে পড়ে না। যারা মাজার ভাঙে, তারা কোনো ধর্মের লোক হতে পারে না। তারা অপরাধী। তাদের শাস্তি পেতেই হবে।’
গতকাল শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার দগরীসার এলাকায় সাধক আবদুল কাদির শাহ (রহ.)-এর ৫৮তম স্মরণোৎসব ও বার্ষিক ওরস উপলক্ষে আয়োজিত ‘সুফিবাদ ও আত্মদর্শন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এই চিন্তক মনে করেন, যারা মাজার ভাঙছে তারা একদিকে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ধর্ম সম্পর্কে এমন একটা ধারণা দিতে চাইছে, যা আদৌ ধর্ম নয়। মাজার ভাঙা একটি ফৌজদারি অপরাধ। মাজার রক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব।
ফরহাদ মজহার বলেন, একটি গোষ্ঠী মনে করে ধর্মের ব্যাপারে কথা বলার একমাত্র অধিকার তাদের এবং তাদের বাইরে আর কেউ কথা বলতে পারবে না। ফলে মাজার ভাঙা হয়েছে, বাউলদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, অত্যাচার চলছে। অনেক বাউলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আবুল সরকার এখনো কারাগারে রয়েছেন। এমনকি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে চিন্ময় প্রভুও এখন পর্যন্ত কারাগারে আছেন, এগুলো অন্যায়। এই অন্যায়গুলো থেকে সমাজকে মুক্ত হতে হবে, রাষ্ট্রকে মুক্ত হতে হবে। এটি ছাড়া প্রীতি-ভালোবাসার সমাজ গড়ে তোলা যাবে না।
একই মঞ্চে গত বৃহস্পতিবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, তাঁর এলাকায় ওয়াজ–কীর্তন যেমন হবে, তেমনি বাউলগানও হবে। এ প্রসঙ্গ তুলে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘বৃহস্পতিবার একই মঞ্চে স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বেশ চমৎকার একটি কথা বলে গেছেন। আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে কীর্তন, বাউলগান, সাধকদের গান, ভক্তির ধারার গান এবং ওয়াজ সবই অন্তর্গত। তিনি বলেছেন, তাঁর এলাকায় সবই চলবে, এটি নিঃসন্দেহে ভালো দিক।’
বিভিন্ন এলাকায় মাজার ভাঙা প্রসঙ্গ তুলে ধরে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘মাজারকে যখন আপনি ভাঙতে যান, এটা ফৌজদারি অপরাধ, এটা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ। কারণ, আমি একমাত্র সঠিক ধর্ম করি, আর অন্যেরটা মিথ্যা-ভুল, এটা বিচার করার ক্ষমতা আল্লাহ মানুষকে দেননি। মাদ্রাসার খারাপ কাজের জন্য আমরা কি কখনো মাদ্রাসা বন্ধ করতে বলেছি? তাহলে মাজারে যদি কোনো খারাপ কাজ হয়ে থাকে তাহলে বলুন, ওটা বন্ধ করা হবে, সংশোধন করা হবে। কিন্তু মাজার যখন আপনারা ভাঙেন তখন এটা ইসলামের চিন্তার মধ্যে পড়ে না।’
মাজারে ভাঙচুরকারীদের বিষয়ে চুপ থাকায় সরকারেরও সমালোচনা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘যে রাষ্ট্র মাজার রক্ষা করতে পারে না, মাজার ভাঙার মতো ফৌজদারি অপরাধ ঠেকাতে পারে না, সেই রাষ্ট্রকে মানার ব্যাপার নাগরিকদের নেই। কারণ আমাকে রক্ষা করা, মাজার রক্ষা করা, আমার বাড়ি–ঘর রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা এখন পর্যন্ত এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে পারিনি, যে রাষ্ট্র মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। আমি মাজারে যাব নাকি অন্য কোথাও—এটা আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। যখন রাষ্ট্র এ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে পারে না, তখন অবশ্যই আমাদের রাষ্ট্রের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে হবে।’
ফরহাদ মজহার আরও বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য থাকলে ওয়াজ বা গানের মাধ্যমে বলা যেতে পারে। কিন্তু বিশেষ পক্ষ নিয়ে অন্য পক্ষকে দমন বা নির্যাতন করা আইনবিরোধী কাজ। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য যখন-তখন যাকে-তাকে ভারতীয় দালাল, ইসকনের দালাল বা বিজেপির দালাল বলে অভিহিত করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ গোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এদের বিষয়ে আমাদের সবাইকে সাবধান হতে হবে।’
ফরহাদ মজহার দাবি করেন, মাজারে যেকোনো ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারে। আস্তিক, নাস্তিক, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ—প্রত্যেকেই মাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতির অংশ। ফলে মাজারের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার অর্থই হলো বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করা।