পটুয়াখালীতে বেড়িবাঁধ কাটা নিয়ে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সংঘর্ষ, আহত ২০

পটুয়াখালীতে মৌকরণ বাজার সংলগ্ন বেড়িবাঁধ কাটা নিয়ে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্য সংঘর্ষ ঘটে। গতকাল শনিবারছবি: প্রথম আলো

পটুয়াখালীতে একটি বেড়িবাঁধ কাটা নিয়ে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় পটুয়াখালী সদর উপজেলার মৌকরণ ও দুমকী উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী মৌকরণ বাজারসংলগ্ন বেড়িবাঁধ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে মৌকরণ ইউনিয়নের বাজারসংলগ্ন পায়রা নদীর একটি শাখা খালের মুখে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বাঁধ নির্মাণের পর মৌকরণ খাল ও এর শাখা খালগুলোতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় ১০ গ্রামের কৃষিজমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

অন্যদিকে বাঁধটি রাখার পক্ষে লেবুখালী ইউনিয়নের কার্তিকপাশা গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, বাঁধ নির্মাণের পর থেকে প্রমত্তা পায়রা নদীর প্রবল স্রোত ও ভাঙন থেকে তাঁরা রক্ষা পেয়েছেন।

বেড়িবাঁধ কাটার পক্ষে থাকা মৌকরণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম আজাদের ছেলে মনিরুজ্জামান কুট্টি বলেন, ‘২০০৮ সালে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নাম ব্যবহার করে মৌকরণ বাজারসংলগ্ন খালে বাঁধ দেন। পরে মাঝখানে আরও কয়েকটি বাঁধ দিয়ে ঘের তৈরি করে মাছ চাষ শুরু করেন। এর পর থেকে মৌকরণ ও আশপাশের গ্রামের শাখা খালগুলোতে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। কৃষিজমি ও ফসল নষ্ট হয়ে মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাঁধ অপসারণের দাবিতে আমরা মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছি, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। বাঁধসংলগ্ন সরকারি জমি দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাঁধ থাকার কারণে বাজারে নৌপথে মালামাল প্রবেশ করতে না পারায় ইজারাদার প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার লোকসানের মুখে পড়ছেন।’

মনিরুজ্জামান কুট্টি বলেন, ‘কিছুদিন আগে পটুয়াখালী সদর ও দুমকী উপজেলার ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে মৌকরণ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক গ্রামবাসীর অর্থায়নে বাঁধটি অপসারণের পরামর্শ দিলে আমরা আজ শনিবার ভেকু মেশিনের মাধ্যমে বাঁধ কাটার উদ্যোগ নিই। কিন্তু খালের অপর প্রান্তের বাসিন্দারা এতে বাধা দিলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বাঁধ কাটার পক্ষে থাকা ১০ থেকে ১২ জন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’

অন্যদিকে বাঁধ কাটার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া লেবুখালী ইউনিয়নের কার্তিকপাশা গ্রামের বাসিন্দা আল আমিন মাহামুদ (৩৬) বলেন, ‘একসময় পায়রা নদীর স্রোত ঢুকে আমাদের গ্রাম প্লাবিত হতো এবং খালপাড়ের ঘরবাড়ি ভাঙনের কবলে পড়ত। পরে ২০০৭ সালের দিকে পাউবো খালটিতে বাঁধ নির্মাণ করে। এর পর থেকে আমরা পায়রা নদীর জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙন থেকে রক্ষা পাই। কিন্তু মৌকরণ ইউনিয়নের কিছু বাসিন্দা ব্যক্তিস্বার্থে বাঁধটি কাটার উদ্যোগ নেয় এবং গতকাল শুক্রবার রাতে মাইকে ঘোষণা দেয়। শনিবার বিকেলে শতাধিক লোক ভেকু মেশিন দিয়ে বাঁধ কাটা শুরু করেন। এ সময় আমার বড় ভাই স্কুলশিক্ষক সোহরাফ হোসেন, আমিসহ কয়েকজন তাঁদের কাছে গিয়ে বাঁধ কাটার কারণ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন আছে কি না জানতে চাই। তখন তাঁরা আমাদের ওপর হামলা চালান। এতে আমার বড় ভাইসহ সাত থেকে আটজন আহত হন। পরে দুমকী থানা-পুলিশকে খবর দিলে তারা ঘটনাস্থলে এসে বাঁধ কাটার কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত দেয়।’

দুমকী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, শনিবার বিকেলে বাঁধ কাটার ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেবুখালী ও মৌকরণ ইউনিয়নের দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়। পরে পুলিশ বাঁধ কাটার কাজ বন্ধ রাখতে বলে। তবে বাঁধ কাটা বা না কাটার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর সিদ্ধান্ত নেবে। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। আহত ব্যক্তিরা আইনগত সহায়তা চাইলে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।