‘আঁরার আজ্জু হত্যে পূরণ অইবো?’

কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে আট বছর ধরে আটকে থাকা প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে ফিরতে পারবেন তাঁরা নিজ দেশে। এবারের ঈদও কেটেছে আগের মতোই ত্রিপলের ঘরে, অভাব-অনিশ্চয়তার মধ্যে। কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, খাদ্যসহায়তা হ্রাস, শিক্ষা ও নিরাপত্তাসংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। রাখাইনের অস্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক জটিলতায় প্রত্যাবাসন আটকে থাকায় রোহিঙ্গাদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

কাঁটাতারে ঘেরা আশ্রয়শিবিরে দিন কাটছে রোহিঙ্গাদের। দেশে ফিরতে না পেরে ঈদেও আনন্দ ছিল না তাঁদের। কক্সবাজারের টেকনাফের জাদিমুরা আশ্রয়শিবিরেপ্রথম আলো

রোহিঙ্গা ভাষায় মনের ইচ্ছা বা আশাকে ‘আজ্জু’ বলা হয়। এ দেশে থাকা ১৪ লাখ রোহিঙ্গা ‘আজ্জু’ বলতে দেশে ফেরার আশাকেই বোঝান। লেদা আশ্রয়শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলম এভাবেই আজ্জু কথাটির অর্থ ব্যাখ্যা করে শোনান। এর আগে তিনি হতাশ হয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ‘আঁরার আজ্জু (ফেরার আশা) হত্যে (কখন) পূরণ অইবো?’

কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে লেদা আশ্রয়শিবিরে গত মঙ্গলবার কথা হচ্ছিল মোহাম্মদ আলমের সঙ্গে। পবিত্র ঈদুল ফিতর কেমন কেটেছে এখানকার বাসিন্দাদের, তা জানতেই লেদা শিবিরে আসা। মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘নিজ দেশে না থাকলে ঈদের আনন্দই তো থাকে না। তবু সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা তাদের মেহমান। কিন্তু মেহমান হয়ে থাকতে কারই ভালো লাগে বলুন। কষ্টে থাকলেও নিজ দেশে নিজ বাড়িতে থাকার অনুভূতিই আলাদা। সেটিই তো আমাদের নেই। পরিবেশ থাকলে আজই দেশে চলে যেতাম।’

লেদা শিবিরের ৩২ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজারের টেকনাফের দমদমিয়া সংরক্ষিত বনের নেচার পার্কের পাশে ৮ বছর আগে গড়ে তোলা হয় জাদিমুরা আশ্রয়শিবির। সেখানে ঠাঁই হয় ৩৭ হাজার রোহিঙ্গার। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা আশ্রয়শিবিরটির পাশেই কক্সবাজার-টেকনাফ আঞ্চলিক সড়ক।

জাদিমুরা আশ্রয়শিবিরের একটি ঘরের সামনে কাঠের বেঞ্চে বসেছিলেন কয়েকজন রোহিঙ্গা। সড়কের ওপারে তাকালে দেখা যায় নাফ নদী, তার ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের বলিবাজার। ২০১৭ সালে সহিংসতার মুখে সব ছেড়ে পরিবার নিয়ে তাঁরা পালিয়ে আসেন এই শিবিরে। তারপর থেকে তাঁদের ঠিকানা এই আশ্রয়শিবির। অনেকগুলো ঈদ কেটেছে এই শিবিরেই। অথচ বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী এবারের ঈদ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাঁদের নিজ বাড়িতে করার কথা ছিল। গত মঙ্গলবার দুপুরে জাদিমুরা আশ্রয়শিবিরে এই প্রশ্ন তুলতেই হেসে ওঠেন আবদুল নবী, রফিক উল্লাহ‍সহ সেখানে বসে থাকা রোহিঙ্গারা।

আশ্রয়শিবিরগুলোতে মানবিক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে জানিয়ে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সংগঠনের সভাপতি ও রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আগে আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু ১৪ ডলার করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হতো। এখন ১২ ডলারে ঠেকেছে। আগামী এপ্রিল মাস থেকে খাদ্যসহায়তা আরও কমছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

আবদুল নবী বললেন, গত বছরের ১৪ মার্চ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেসকে সঙ্গে নিয়ে উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে এসে লাখো রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করেছিলেন। সেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আগামী বছর (এই ঈদ) রোহিঙ্গারা ঈদ করবেন রাখাইন রাজ্যের জন্মভূমিতে। তার আগেই জাতিসংঘের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে। কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি।

তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রফিক উল্লাহ বলেন, এই আশ্রয়শিবিরের ত্রিপলের ছাউনিতে আটটা ঈদ কেটেছে। কোনো ঈদ আরাকানের (রাখাইন) মতো (উৎসবমুখর) হয়নি। ঈদের নামাজ শেষে রোহিঙ্গারা মা–বাবা, দাদা–দাদিসহ আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করেন। এখানে তার সুযোগ নেই। ক্যাম্পে বিনা মূল্যে খাদ্যসহায়তা পাওয়া যাচ্ছে ঠিক। কিন্তু শান্তি নেই, বন্দিজীবন আর ভালো লাগে না।

কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবির
প্রথম আলো

উখিয়ার কুতুপালং, লম্বাশিয়া, মধুরছড়া, বালুখালী আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেও হতাশার কথা জানা গেল। নিজের দেশে ঈদ করার আশা বা ‘আজ্জু’ পূরণ হবে কি না, জানতে চান রোহিঙ্গারা।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাখাইন রাজ্য ত্যাগ করে স্বামীর সঙ্গে তিন সন্তান নিয়ে টেকনাফ পালিয়ে লেদা আশ্রয়শিবিরে আসেন গোলজার বেগম। গত আট বছরে আশ্রয়শিবিরে জন্ম নিয়েছে আরও পাঁচ সন্তান। ঘরের একটি অংশ দোকান বানিয়ে সেখানে বিক্রি করেন পান-সিগারেট। গোলজার বলেন, এবারের ঈদ তাঁদের ভালো যায়নি। প্রতিবার ঈদে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গরুর মাংসের সঙ্গে চালের রুটি পরিবেশন করা হতো। অর্থসংকটে তা এবার হয়ে ওঠেনি। কয়েকটি ক্যাম্পে শিশুদের জন্য নাগরদোলার ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু বড়দের জন্য বিনোদনের কিছুই ছিল না।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

মধুরছড়ার আশ্রয়শিবিরের পাহাড়ের ঢালুতে নির্মিত দুই কক্ষের ত্রিপলের ছাউনিতে স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে থাকেন রোহিঙ্গা সালামত উল্লাহ। যে খাদ্যসহায়তা তিনি পাচ্ছেন, তা দিয়ে এক মাস চলে না জানিয়ে সালামত উল্লাহ বলেন, আগে ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে কাজকর্ম করে দৈনিক ৩০০-৫০০ টাকা পাওয়া যেত। কড়াকড়ির কারণে তা–ও সম্ভব হচ্ছে না। আশ্রয়শিবিরে নিরাপত্তাও নেই। তহবিল–সংকটের কারণে শিশুদের স্কুলও বন্ধ হয়ে গেছে। রাখাইনে ফিরে যাওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের কী অবস্থা হবে, ভেবে দিশা হারিয়ে ফেলছেন তিনি।

ওই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা জালাল আহমদ বলেন, এক বছর ধরে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে। তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দা-কুমড়ার সম্পর্ক। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনও সম্ভব হবে না।

বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখ। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে এসেছে আট লাখ রোহিঙ্গা। এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে নতুন করে ঢুকেছে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা।

আশ্রয়শিবিরসমূহে মানবিক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে জানিয়ে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সংগঠনের সভাপতি ও রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আগে আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু ১৪ ডলার করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হতো। এখন ১২ ডলারে ঠেকেছে। আগামী এপ্রিল থেকে খাদ্যসহায়তা আরও কমছে বলে খবর পাওয়া গেছে। প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে মাদক-সন্ত্রাসে জড়াতে পারে রোহিঙ্গা তরুণ–কিশোরেরা। ইতিমধ্যে পাচারের শিকার হচ্ছে শত শত নারী–শিশু।

আশ্রয়শিবিরে আটটি ঈদ কেটেছে রোহিঙ্গা নারী গোলজার বেগমের। কবে দেশে ফিরবেন জানেন না তিনি। গত মঙ্গলবার টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবিরে
প্রথম আলো

বিএনপি সরকারের প্রতি প্রত্যাশা বেশি বলে জানান রোহিঙ্গাদের সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার নেতা মোহাম্মদ রফিক। তিনি বলেন, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালেও দুই দফায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গার আগমন ঘটেছিল, তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। তখন আলোচনার মাধ্যমে বিএনপি সরকার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছিল। তাই রোহিঙ্গাদের আশা, অতীতের মতো এবারও বিএনপি সরকারই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে।

প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আপাতত দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই জানিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, তবে সরকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। নতুন করে যেন আর কোনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ না ঘটে, সে বিষয়ে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের অবকাঠামোগত সমস্যা, আর্থিক সংকট-সংঘাত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।