বরিশাল–রংপুরে ব্যয় ও সময় বাড়লেও কাজ শেষ হচ্ছে না, খুলনায় বাতিল

২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রংপুর নভোথিয়েটার প্রকল্প অনুমোদন পায়। এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৮০ শতাংশ। সম্প্রতি রংপুরের দেবীপুরেছবি: প্রথম আলো

বিজ্ঞানশিক্ষা, মহাকাশবিষয়ক জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষামূলক পর্যটনের প্রসার ঘটাতে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে নভোথিয়েটার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। শত শত কোটি টাকার এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেক জায়গায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বরিশাল ও রংপুরে নভোথিয়েটার প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা দুই দফা বাড়ানোর পরও কাজ শেষ হয়নি। অন্যদিকে এক যুগের বেশি সময় ধরে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতার কারণে খুলনার প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে গেছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বরিশাল ও রংপুরে দুটি প্রকল্পের অবকাঠামোর প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে গণপূর্ত বিভাগের একটি সূত্র বলছে, বাস্তবে অবকাঠামো দৃশ্যমান হলেও মূল প্রযুক্তিগত অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। বিশেষ করে ডোম, টেলিস্কোপ, ডিজিটাল প্রজেকশন ও অন্যান্য ইলেকট্রোমেকানিক্যাল সরঞ্জামের স্থাপন এখনো হয়নি। এসব যন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

নভোথিয়েটারগুলো চালু হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মহাকাশবিজ্ঞান চর্চার নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, এখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও টেলিস্কোপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মহাকাশ সম্পর্কে জানতে পারবে। এতে তাদের বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও আগ্রহ বাড়বে।

অবকাঠামো শেষ, অপেক্ষা সরঞ্জামের

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, বরিশাল’ নামে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নাম পরিবর্তন করে ‘বরিশাল নভোথিয়েটার’ করা হয়। প্রথমে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষের কথা ছিল। পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর করা হয়। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কন্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।

নির্ধারিত সময়ে বরিশালে নভোথিয়াট নির্মাণকাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি নগরের চর আইচা এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

নগরের দক্ষিণে কীর্তনখোলা নদীর পূর্ব পাশে চর আইচা এলাকায় ১০ একর জমিতে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরুতে ব্যয় ধরা হয় ৪১২ কোটি টাকা। ইলেকট্রোমেকানিক্যাল সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরে ব্যয় বাড়িয়ে ৪৬০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত নভোথিয়েটারে প্ল্যানেটারিয়াম, কার্যালয় ভবন, প্লাজা, ডরমিটরি ও দুটি বৃহৎ ডোমসহ মোট ২৬টি অবকাঠামো থাকছে। দর্শনার্থীদের জন্য ১৭৫টি গাড়ি পার্কিং সুবিধা, ৩০৪ আসনের গ্যালারি ও ১৭৫ আসনের আধুনিক অডিটোরিয়ামের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য ছয়টি শিশুপার্ক, ভাস্কর্য ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক রাইড থাকছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বৈদ্যুতিক কাজের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। শিগগির বিদ্যুৎ-সংযোগ দিয়ে কমিশনিং করা হবে। তবে ডোম, টেলিস্কোপ, ডিজিটাল প্রজেকশন ও অন্যান্য ইলেকট্রোমেকানিক্যাল সরঞ্জাম এখনো স্থাপন করা হয়নি। এগুলো বিদেশ থেকে আমদানির পর বসানো হবে।

গত ৩০ এপ্রিল দেখা যায়, শ্রমিকেরা ওঠার সিঁড়িতে টাইলস স্থাপন করছেন। কেউ মেঝেতে ঢালাই দিচ্ছেন। আবার একদল শ্রমিক তৈরি করছেন স্টিলের অবকাঠামো। তবে অবকাঠামোর সাজসজ্জার অনেক কাজ এখনো বাকি। সেখানে কর্মরত শ্রমিকেরা জানালেন, তাঁরা অনেক শ্রমিক এখানে কাজ করছেন। তবে এখনো যে কাজ বাকি, তাতে নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে কি না, সন্দেহ আছে।

চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত বরিশাল নভোথিয়েটারে প্ল্যানেটারিয়াম, কার্যালয় ভবন, প্লাজা, ডরমিটরি ও দুটি বৃহৎ ডোমসহ মোট ২৬টি অবকাঠামো থাকছে। সম্প্রতি নগরের চর আইচা এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এটি দেশের আইকনিক একটি প্রকল্প। প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করেছেন, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়—চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে। কাজে বিলম্বের বিষয়ে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে শুরু থেকেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। কীর্তনখোলার তীরবর্তী ঢালু জমিতে কাজ হওয়ায় বেজমেন্ট তৈরিতেই প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে। বর্ষাকালে কাজ ব্যাহত হওয়ায় ব্যয় ও সময় বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ শ্রমিক কাজ করছেন এবং কাজ দ্রুতগতিতে চলছে।

অবকাঠামো নির্মাণ ৮০ শতাংশ শেষ

রংপুর নগর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে দেবীপুরে রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কের পাশে ১০ একর জমিতে নভোথিয়েটার নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস জামাল অ্যান্ড কোম্পানি। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কয়েক মাস প্রকল্পটির কাজ বন্ধ ছিল। এ ছাড়া জমি উন্নয়নকাজেও দেরি হয়। ইতিমধ্যে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদন পায় রংপুর নভোথিয়েটার প্রকল্প। প্রায় ৪১৮ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম ও দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৪৪৫ কোটি টাকা। এরপরও নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের শতভাগ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় আছে।

রংপুর নভোথিয়েটার নির্মাণ প্রকল্পের কাজের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি রংপুরের দেবীপুরে
ছবি: প্রথম আলো

সম্প্রতি দেখা যায়, নভোথিয়েটারের প্ল্যানেটেরিয়াম ভবন, কার্যালয় ও ডরমিটরির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। টাইলস মার্বেলের কাজ চলমান। অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতের কাজও চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, অবকাঠামো নির্মাণের তেমন কোনো কাজ বাকি নেই। টাইলসের কিছু কাজ বাকি। আগামী আগস্টের মধ্যে নির্মাণাধীন অবকাঠামো হস্তান্তর করা হতে পারে।

নভোথিয়েটার রংপুর স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, অবকাঠামোগত কাজ ৮০ শতাংশ হয়েছে। ইমারসিভ সিমুলেশন থিয়েটার চলে এসেছে। সায়েন্টিফিক এক্সিবিট, ডিজিটাল এক্সিবিট, প্লানেটেরিয়ামসহ অন্য সরঞ্জামের দরপত্র হয়েছে। সেগুলোও চলতি বছরের মধ্যে চলে আসবে। আগামী ডিসেম্বরে মেয়াদ থাকার সময়ের মধ্যে তাঁরা কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন।

এক যুগ পর প্রকল্প বাতিল

এক যুগের বেশি সময় ধরে আলোচনা, স্থান নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা, একনেকে অনুমোদন, জমি হস্তান্তর ও দরপত্র প্রস্তুতির পরও শেষ পর্যন্ত খুলনার নভোথিয়েটার নির্মাণ প্রকল্পটি বাতিল হয়ে গেছে। খুলনা নগরের জোড়াগেট সিঅ্যান্ডবি কলোনি এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ করা হলেও খেলার মাঠ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের আপত্তির মুখে মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় নভোথিয়েটার নির্মাণের জন্য ৫ একর জমি নির্ধারণে ২০১২ সালে প্রথম খুলনা সিটি করপোরেশনকে (কেসিসি) চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়। পরে ২০১৩ সালের ১১ জুন নগরের মোংলা পোর্ট স্কুল-সংলগ্ন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের জমি, ২১ নম্বর ওয়ার্ডে শিল্পব্যাংকের পেছনের জমি এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ডে আহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতির জমির মধ্যে যেকোনো একটি স্থানে নভোথিয়েটার নির্মাণের প্রস্তাব দেয় কেসিসি। কিন্তু এসব জমি পাওয়া কঠিন হওয়ায় জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প স্থান খোঁজার পরামর্শ দেয় মন্ত্রণালয়। পরে নগরের মুজগুন্নি এলাকায় পর্যটন করপোরেশনের জমির প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেটি পাওয়া যায়নি।

সূত্রটি জানায়, নগরের জিরো পয়েন্ট এলাকায় কৃষ্ণনগর মৌজার ১০ একর জমি পছন্দ হলেও অধিগ্রহণ ব্যয় বেশি হওয়ায় বাদ পড়ে যায়। সর্বশেষ ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নগরের জোড়াগেট সিঅ্যান্ডবি কলোনি এলাকায় ১০ একর জমিতে নভোথিয়েটার নির্মাণের প্রকল্প একনেকে পাস হয়। ব্যয় ধরা হয় ৫৫৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সেই অনুযায়ী কাজও শুরু হয়। কিন্তু খেলার মাঠ রক্ষার দাবিতে ওই জমি নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন আপত্তি তুলে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেয়। পরে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।

গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানায়, সিঅ্যান্ডবি কলোনিকে ঘিরে একটি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পুরোনো ভবন ভেঙে আধুনিক আবাসন, পার্ক ও নতুন খেলার মাঠ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সেই মোতাবেক কাজও চলছিল। অনেকেই সেটিকে নভোথিয়েটার প্রকল্পের অংশ মনে করে বিরোধিতা করেন। তবে নভোথিয়েটারের সঙ্গে এসব কার্যক্রমের সম্পর্ক ছিল না বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

গণপূর্ত বিভাগের খুলনা-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল সিঅ্যান্ডবি কলোনির ৮ দশমিক ৩৫১ একর জমি নভোথিয়েটার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। ওই জায়গায় ভবিষ্যতে কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত সরকার নেবে।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই খুলনা উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। নগরের সিঅ্যান্ডবি কলোনিতে নভোথিয়েটারটি নির্মাণের কথা ছিল। নাম ও স্থান পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তারপরও স্থানীয় আপত্তির অজুহাতে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিকল্প স্থানেও এটি বাস্তবায়ন করা যেত।