ফাঁদে পড়া বাঘিনীটি এখনো শঙ্কামুক্ত নয়, খাদ্যগ্রহণ ও হুংকারে উন্নতির ইঙ্গিত
সুন্দরবনে হরিণশিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে আহত হওয়া বাঘিনীটি এখনো পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নয়। চিকিৎসক ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঘিনীটি পানি পান ও খাদ্যগ্রহণ শুরু করেছে এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে হুংকার দিচ্ছে। এখনো পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত বলা না গেলেও ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।
আজ বুধবার বেলা তিনটার দিকে খুলনা প্রেসক্লাবের হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাঘিনীটির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন বন বিভাগ ও চিকিৎসক দলের সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকা থেকে আহত বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা হয়। এখন এটি খুলনায় বন বিভাগের বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। উদ্ধারকালে বাঘিনীটি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় ছিল। চিকিৎসা শুরুর পর ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। পানি পান ও খাদ্যগ্রহণ শুরু করেছে এবং ধীরে ধীরে বাঘিনীটির স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা ফিরে আসছে।
ইমরান আহমেদ জানান, বাঘিনীটি এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত না হওয়ায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের অধ্যাপক হাদী নুর আলী খানের নেতৃত্বে ঢাকা থেকে একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল গতকাল রাতে খুলনায় আসে। দলটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শেষে আজ সকালে আবার নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণের বরাতে বন সংরক্ষক বলেন, ফাঁদে আটকে থাকায় বাঘিনীটির সামনের বাঁ পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলনভঙ্গি দেখে চিকিৎসকেরা ধারণা করছেন, পায়ের কোনো হাড় ভাঙেনি, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। চিকিৎসকদের আশা, স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে আবার বনে ফিরে যেতে পারবে। তবে ক্ষত শুকানোর প্রক্রিয়া চলায় মানুষের সমাগম হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এ জন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বাঘিনীটির সুস্থ হতে কত সময় লাগতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকার সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ের ত্বক, পেশি ও শিরার স্তর কেটে গেছে। ক্ষত হাড় স্পর্শ করেছে কি না, এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে আশার কথা হচ্ছে, এটি পা মাটিতে রাখতে পারছে। তিনি বলেন, যেহেতু এটি একটি বন্য প্রাণী। বেঙ্গল টাইগার সাধারণত একা একাই শিকার করে। তাই একে পুরোপুরি ফিট না করে ছাড়া যাবে না। একে পূর্ণাঙ্গ ফিট করার জন্য স্বল্প সময় লাগতে পারে, আবার দেখা যাচ্ছে লম্বা সময়ও লাগতে পারে।
বর্তমানে বাঘিনীটি তিন দিক (প্যারামিটার) থেকে আনফিট আছে। সামনের বাঁ পায়ে ব্যথা ও প্রদাহ, শরীরের পানিশূন্যতা ও মাংসপেশির দুর্বলতা। শিকার করার সময় দুই পা পূর্ণাঙ্গরূপে ব্যবহার করতে না পারলে নিজেই বিপদের মুখে পড়তে পারে। এ জন্য প্রথম ধাপে ১০ দিনের চিকিৎসার কোর্স দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে দ্বিতীয় ধাপের চিকিৎসা শুরু করা হবে।
বন বিভাগ জানায়, গত রোববার দুপুরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের সহায়তায় ‘ট্রাংকুলাইজার গান’ ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে অচেতন করা হয়। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও চতুর্থবারে সফলতা আসে। এরপর ফাঁদ কেটে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করে লোহার খাঁচায় করে খুলনায় আনা হয়। ইনজেকশন দেওয়ার দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই বাঘিনীটির জ্ঞান ফিরে আসে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের অধ্যাপক হাদী নুর আলী খান বলেন, বাঘিনীটির বয়স আনুমানিক চার বছরের কিছু বেশি। রোববার কিছু না খেলেও সোমবার প্রায় এক কেজি এবং গতকাল মঙ্গলবার প্রায় দুই কেজি মাংস খেয়েছে। আজও খাদ্যগ্রহণ করছে। তবে একবারে বেশি মাংস দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, খাবারের সঙ্গে ওষুধ মেশানো হচ্ছে। একবার বেশি খেয়ে ফেললে পরবর্তী সময়ে খেতে না চাইতে পারে। ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে হুংকার দিয়েছে। এখনো পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত বলা না গেলেও ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।
এ ঘটনায় অবৈধভাবে ফাঁদ পাতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত শুরু হয়েছে। উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি এবং বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। একই সঙ্গে সুন্দরবনে অবৈধ ফাঁদ পাতা ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের অধ্যাপক মো. গোলাম হায়দার এবং কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগার (সিডিআইএল), ঢাকার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. গোলাম আযম চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।