সোমবার দুপুর ১২টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম সদর এলাকায় পা রাখতেই টের পাওয়া গেল নির্বাচনের উত্তাপ। চায়ের দোকান, অটোরিকশার স্ট্যান্ড কিংবা বাজার—সবখানেই আলোচনা জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আলোচনায় ঘুরেফিরে উঠে আসে কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের প্রার্থীদের নাম।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে কয়েকজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক ভোট নিয়ে আলাপ করছিলেন। তাঁদের একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব মুহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, ‘অনেক বছর ভোট দিতে পারিনি। এবার পারব, এটাই আনন্দ। তাই দল নয়, মানুষ দেখে ভোট দিতে চাই। কে নির্বাচিত হলে চৌদ্দগ্রামের বেশি উন্নয়ন হবে, সেটাই এখন মানুষ ভাবছেন।’ তাঁর মতো অনেক ভোটারের কথায় উঠে আসে, এবার ভোটে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি বড় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, চৌদ্দগ্রামে ভোটের মাঠ ততই সরগরম হয়ে উঠছে।
কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কারণে ভোটের মাঠে তিনি ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী হিসেবে পরিচিত। তাঁর পক্ষে দলীয় নেতা-কর্মীরা মাঠে সক্রিয়। প্রতিটি গ্রাম ও পাড়ায় নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেও সভা-সমাবেশ ও কর্মীদের বৈঠকে অংশ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কামরুল হুদাও ভোটের মাঠে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। কামরুল হুদা চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তিনিও বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। কামরুল হুদা প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের একাধিকবার নির্বাচনী লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সর্বশেষ ২০০১ সালে তিনি বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। কামরুল হুদা বিগত সময়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
সোমবার গুণবতী বাজারের একটি চায়ের দোকানে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা এমরান হোসেনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিগত সময়ে গুণবতীসহ আশপাশের ইউনিয়নগুলো বেশি অবহেলার শিকার হয়েছে। উন্নয়ন হয়নি বললেই চলে; এলাকার প্রায় রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা। তাই এবার এই অঞ্চলের মানুষ বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেবেন। সোমবার বিকেলে গুণবতী ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্রীপুর ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এর আগে বেলা ১১টার দিকে নিজের একটি কার্যালয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘চৌদ্দগ্রামের মানুষের প্রতি আমার যেমন অগাধ আস্থা ও ভালোবাসা রয়েছে, তেমনি তারাও আমাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে। ২০০১ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর আমার মূল উদ্দেশ ছিল চৌদ্দগ্রামকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে শান্ত রাখা। কারণ, এর আগে চৌদ্দগ্রামে অরাজক পরিস্থিতি ছিল। আমি সেটি করতে পেরেছি। মানুষ তখন শান্তিতে বসবাস করেছিল। এ কারণেই চৌদ্দগ্রামে দলীয় সমর্থনের বাইরেও মানুষ ব্যক্তি তাহেরকে সমর্থন করে।’
এবারের নির্বাচন নিয়ে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘চৌদ্দগ্রামের ইউপির সাবেক চেয়ারম্যানদের প্রায় সবাই আমাকে সমর্থন দিয়েছেন; ইতিমধ্যে কয়েক শ মেম্বার নিয়ে আমরা সভা করেছি। ভোটের মাঠে জনমত আমাদের পক্ষেই দেখছি। আমি আশাবাদী, ২০০১ সালে মানুষ যেভাবে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে দ্বিগুণ ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছিল, এবার তার চেয়ে বেশি ভোটে মানুষ আমার পক্ষে রায় দেবে।’
বিএনপির একটি বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন দাবি করে জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ২০০১ সালে চার–দলীয় জোট থেকে তিনি নির্বাচন করেছিলেন। বিএনপির একটি বড় অংশ সমর্থন করছে। অনেকে প্রকাশ্যে, আবার অনেকে অপ্রকাশ্যে সমর্থন করছে। অন্যান্য দলেরও একটি বড় অংশ দলীয় বিবেচনার বাইরে, ব্যক্তি বিবেচনায় তাঁকে সমর্থন করছে। চৌদ্দগ্রামের নারীদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সমর্থন করছে; গ্রামভিত্তিক নারী সমাবেশগুলোর উপস্থিতি,সেটাই এটাই প্রমাণ করে।
দক্ষিণ শ্রীপুর ঈদগাহ মাঠে আজকের নির্বাচনী সমাবেশে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু এমপি বানানোর নির্বাচন নয়। বাংলাদেশের ভাগ্য পরিবর্তনের নির্বাচন। অতীতে যারাই সরকার গঠন করেছে, সবাই খুন, দখলদারি, চাঁদাবাজি আর দুর্নীতি করেছে। আল্লাহর রহমতে ১১-দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে। দলীয় পরিচয়ের বাইরে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, এমন নেতা নির্বাচিত করুক জনগণ। তিনি আশাবাদী চৌদ্দগ্রামের ১৪ ইউনিয়নেই দাঁড়িপাল্লা এবার প্রথম হবে।
গুণবতী ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মো. ইউসুফের সভাপতিত্বে সমাবেশে স্থানীয় ও উপজেলার নেতারা বক্তৃতা করেন। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমির মু. মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চৌদ্দগ্রামে তাহেরের গ্রহণযোগ্যতা দলীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ তাঁর অতীত কাজ, সততা ও ব্যক্তিত্বের কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর ব্যক্তিত্বকে প্রাধান্য দেবেন ভোটাররা।