১২ মামলায় দণ্ডিত জেল পলাতক সেই আনিছুর অবশেষে পুলিশের জালে

মো. আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা–পুলিশের একটি বিশেষ দলছবি: প্রথম আলো

গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার ১২৪টি মামলার পরোয়ানাভুক্ত ও ১২টি মামলার সাজাপ্রাপ্ত কারাগার থেকে পালানো আসামি মো. আনিছুর রহমানকে (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা–পুলিশের একটি বিশেষ দল তাঁকে গ্রেপ্তার করে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

আনিছুর রহমান কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সদরপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ২০০৬ সালে নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিননগর এলাকায় ‘বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের’ অধীনে ‘বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন।

পুলিশ, এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৬ সালে আলাউদ্দিননগরে মূল কার্যক্রম শুরু করার পর কয়েক বছরের মধ্যে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, পাবনা, ঝিনাইদহসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় শাখা খোলেন আনিছুর রহমান। সেসব শাখায় গ্রাহকদের ‘জমার দ্বিগুণ টাকা ফেরত’ দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন মেয়াদে মোটা অঙ্কের টাকা জমা নেওয়া হতো।

একপর্যায়ে সাধারণ মানুষের প্রায় ২০০ কোটি টাকা জমা হলে আনিছুর রহমান দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি, বাড়ি, গাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালের শুরুতে মাঠকর্মী ও গ্রাহকেরা বিষয়টি টের পেয়ে লগ্নিকৃত টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। অবস্থা বেগতিক দেখে ওই বছরের নভেম্বরে অফিসে তালা ঝুলিয়ে আনিছুর লাপাত্তা হয়ে যান।

আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার প্রায় ১২৪টি মামলা হয়। এসব মামলায় আদালত তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন। পরে ১২টি মামলায় তাঁর বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়।

এরপর ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আনিছুর রহমানকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে আরও ১০৪ আসামির সঙ্গে আনিছুরও পালিয়ে যান বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তারের খবরে থানায় হাজির হন ভুক্তভোগী আবদুল মাজেদ ও তাঁর স্ত্রী বিনা খাতুনসহ অনেকে
ছবি: প্রথম আলো

কুমারখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহাগ শিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আনিছুর রহমানকে ধরতে কয়েক মাস ধরে কাজ করে আসছি। তবে তাঁর অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নিজে কোনো মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না। কারাগার থেকে পালানোর পর নারায়ণগঞ্জ, রাজধানীর শাহবাগ ও উত্তরা এলাকায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বাড়িতে থাকতেন।’

আনিছুরকে ধরতে নিজে দুবার অভিযান চালিয়েছেন বলে জানান এসআই সোহাগ শিকদার। তিনি বলেন, সর্বশেষ এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে ছেলের উত্তরার বাসায় আনিছুরের অবস্থান করার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর গতকাল রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

‘হয় টাকা ফেরত দিক, নইলে ওর ফাঁসি দিক’

এদিকে আনিছুর রহমানের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে আজ সকালে কুমারখালী থানা চত্বরে ভিড় করেন অনেক ভুক্তভোগী গ্রাহক। এ সময় রাজবাড়ীর পাংশার মাছপাড়া এলাকার বৃদ্ধ আবদুল মাজেদ (৬৪) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সারা জীবন গার্মেন্টসে চাকরি করে সাড়ে ১১ লাখ টাকা জমাইছিলাম। চার বছরে দ্বিগুণ লাভের আশায় আনিছের এনজিওতে রাখছিলাম। দুই বছরের মাথায় সব টাকা নিয়ে পালাইছিল।’ এ সময় তাঁর স্ত্রী বিনা খাতুন বলেন, ‘দ্বিগুণ লাভের আশায় এখন সব শেষ। সর্বহারা হয়ে (সব হারিয়ে) থানায় এসেছি।’

২০১৩ সাল থেকে ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা কুমারখালীর জাহেদপুর গ্রামের জাহানারা খাতুন বলেন, ‘চাকরির বেতন–বোনাস, জমি ইজারার টাকা, গরু–ছাগল বিক্রির টাকাসহ জীবনের সঞ্চিত প্রায় ৩০ লাখ টাকা আনিছকে বিশ্বাস করে দিয়েছিলাম। সব মেরে দিয়ে চলে গেছে।’

আনিছুরের নিজ ভাগনি বিনা খাতুনও রেহাই পাননি তাঁর প্রতারণা থেকে। তিনি বলেন, ‘মামার কাছে তিন লাখ টাকা রাখছিলাম। এখন সব শেষ। হয় টাকা ফেরত দিক, নইলে ওর ফাঁসি দিক সরকার।’

কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে সুকৌশলে আনিছুর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট কারাগার ভেঙে পালিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ চেষ্টার পর তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।