পূর্ব চুনাখালী গ্রামে সারা বছরই তৈরি হয় নৌকা
গ্রামের ভেতর ঢুকলেই কানে আসে ঠকঠক শব্দ। সূর্য ওঠার আগেই নৌকা তৈরির কাজ শুরু করেন কারিগরেরা। কেউ কাঠ কাটেন, কেউ পেরেক ঠোকেন। কেউবা নৌকা তৈরির পর কাঠ ঘষে মসৃণ করেন। বছরের বারো মাসই চলে এ কর্মযজ্ঞ।
গ্রামটির নাম পূর্ব চুনাখালী। এটি বরগুনার আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নে অবস্থিত। এলাকায় গ্রামটি নৌকা তৈরির প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে; পরিচিতি পেয়েছে নৌকার গ্রাম হিসেবে।
আমতলী উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে পূর্ব চুনাখালী গ্রাম। সম্প্রতি বরিশাল-কুয়াকাটা সড়ক দিয়ে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে ছোট ছাপড়া ঘরে নৌকা তৈরির কাজ করছেন বারেক হাওলাদার (৭৮)। পাঁচটি নৌকা পাশাপাশি রাখা।
কথায় কথায় জানা গেল বারেক হাওলাদারের জীবনে গল্প। একসময় তিনি শিক্ষকতা করতেন। বেতন কম হওয়ায় সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। চাকরি ছেড়ে বাপ-দাদার পেশায় যোগ দেন; শুরু করেন নৌকার ব্যবসা। প্রথম জীবনে তিনি নৌকার ব্যবসায়ী ছিলেন। নৌকা তৈরি করে বিক্রি করতেন। তবে নৌকা তৈরির কাঠ সংগ্রহ করা সহজ নয়। এসব কারণেই নৌকা বিক্রির ব্যবসা ছেড়ে দেন। বর্তমানে তিনি গ্রামের এক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে নৌকা তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিটি নৌকা তৈরি বাবদ তিনি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পান। বারেক হাওলাদারের মতো গ্রামের ২০-২৫টি পরিবার নৌকার কাজ করে।
পূর্ব চুনাখালী গ্রামে তৈরি নৌকাকে ডিঙি বলা হয়। এগুলো অল্প পানিতেও চলতে পারে। কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা হাটবাজারে যাতায়াত—প্রভৃতি কাজে এই নৌকার রয়েছে চাহিদা। প্রতিটি নৌকার দাম নির্ধারণ হয় আকার ও কাঠের মান অনুযায়ী।
নৌকার কারিগর ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় সামাজিক বন থেকে চাম্বল, মেহগনি, রেইনট্রিগাছ কেনেন পাইকারেরা। তাঁদের কাছ থেকে এসব গাছ কেনেন নৌকার ব্যবসায়ীরা। সেই কাঠ চেরাই করা হয় স মিলে। এরপর নৌকা তৈরির জন্য কাঠ উপযোগী করা হয়। প্রকারভেদে একেকটি নৌকার দাম ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা।
প্রতি সপ্তাহে একজন কারিগর ৪-৫টি নৌকা তৈরি করতে পারেন। ১০-১৫ বছর আগেও নৌকার অনেক চাহিদা ছিল। তখন সপ্তাহে একেকজন ব্যবসায়ী ১০-১২টি নৌকা বিক্রি করতেন। নানা কারণে এখন নৌকার ব্যবহার ও চাহিদা কমেছে। এ পেশায় কত দিন টিকবেন, তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন কারিগরেরা।
নৌকার কারিগর বারেক হাওলাদার বলেন, আগে বিভিন্ন আকারের নৌকার ব্যাপক চাহিদা ছিল। কৃষক কৃষিকাজে, পণ্য পরিবহন, খেয়াঘাটগুলোতে পারাপারসহ নানা কাজে নৌকা ব্যবহার করতেন। এখন চাহিদা কমে গেছে। তবে বর্ষা মৌসুমে কারিগরেরা দম ফেলার সময় পান না। মাসে ২০-২৫টি নৌকা তৈরি করেন।
পূর্ব চুনাখালী গ্রামে তৈরি নৌকাকে ডিঙি বলা হয়। এগুলো অল্প পানিতেও চলতে পারে। কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা হাটবাজারে যাতায়াত—প্রভৃতি কাজে এই নৌকার রয়েছে চাহিদা।
এখানকার তৈরি করা নৌকা গ্রামের বাজারে বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া অনেকে পাশের উপজেলা কলাপাড়ায় নিয়েও নৌকা বিক্রি করেন। নৌকা বিক্রির ব্যবসায় দীর্ঘদিন ধরে জড়িত আছেন চুনাখালী গ্রামের রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাবার দেখাদেখি আমি নৌকা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হই। অনেক বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। বাবা-দাদাসহ পূর্বপুরুষেরা এ পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কালের বিবর্তনে এই পেশা হারিয়ে যাচ্ছে। আগে নৌকার অনেক চাহিদা ছিল। এখন আর আগের মতো চাহিদা নেই। সরকারিভাবে শহজ শর্তে ঋণ দিলে এই শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব।’
আমতলীর কুকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন আহম্মেদ ওরফে মাসুম তালুকদার বলেন, ‘পূর্ব চুনাখালী এখন নৌকা তৈরির গ্রাম হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। বছরে সেখানে দুই হাজারের মতো নৌকা তৈরি হয়। বছরে এক কোটি টাকার মতো নৌকা বিক্রি হয়।