ফেসবুক রিল, চ্যাটজিপিটি আর অ্যালগরিদম আমাদের যেভাবে ঘিরে রেখেছে

চট্টগ্রামে চলছে ‘অ্যালগরিদমিক বডিস’ শিরোনামের ডিজিটাল দৃশ্যশিল্পের ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী। সিসিটিভি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফেসবুক, চ্যাটজিপিটি ও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিজীবন, নজরদারি, আসক্তি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর প্রযুক্তির প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। আট শিল্পীর শিল্পকর্মে ডিজিটাল জীবনের সঙ্গে পানি ও পরিবেশ, গ্রামীণ জীবন, বাস্তবতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পার্থক্য এবং এআইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। প্রদর্শনী দর্শকদের প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি চলবে।

অ্যালগরিদমিক বডিজ শিরোনামে চট্টগ্রামের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ গ্যালারিতে চলছে ডিজিটাল মাধ্যমের দৃশ্যশিল্পের প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) হেডসেটে শিল্পকর্ম দেখছেন একজন দর্শক। গতকাল সন্ধ্যায় তোলাপ্রথম আলো

অন্ধকার প্রদর্শনীকক্ষে ঢুকতেই মুখোমুখি হতে হয় সিসিটিভি মনিটরের। সেখানে ঝুলন্ত মনিটরে দর্শক নিজেকে আবিষ্কার করে একটু হোঁচট খান। সব গুরুত্বপূর্ণ ভবনেই সিসিটিভি ক্যামেরা থাকে। কিন্তু সিসিটিভি মনিটরে আগন্তুকেরা নিজেদের দেখতে পান না। দেখলে অস্বস্তি বাড়ত নির্ঘাত। এখানে সে কথাই মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যেন। আরও একটু ভাবলে মনে পড়তে পারে, জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ উপন্যাসের বিখ্যাত সংলাপের কথা, ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ।’

ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা কীভাবে শিল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অথবা ডিজিটাল মাধ্যম কীভাবে শহরের বা গ্রামের একজন সাধারণ মানুষকেও তাঁর অদৃশ্য জালে বন্দী করেছে, প্রদর্শনী দেখতে দেখতে দর্শকের মনে এসব প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যায়। দেয়ালজুড়ে প্রজেক্টরে নানা দৃশ্যের প্রক্ষেপণ, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) হেডসেট কিংবা ল্যাপটপে খুলে রাখা চ্যাটজিপিটি সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না; বরং দর্শকের সামনে আরও নতুন সব প্রশ্নের উদ্রেক করে।

‘অ্যালগোরিদমিক বডিজ’ শিরোনামে চট্টগ্রামের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ গ্যালারিতে চলছে ডিজিটাল মাধ্যমের দৃশ্যশিল্পের প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে শিল্পকর্ম দেখছেন একজন দর্শক
প্রথম আলো

চট্টগ্রামের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তনে গতকাল শুক্রবার শুরু হওয়া ‘অ্যালরিদমিক বডিস’ শিরোনামে ডিজিটাল দৃশ্যশিল্পের ‘ট্রান্স ডিসিপ্লিনারি’ প্রদর্শনী সব দিক থেকেই ব্যতিক্রম। চট্টগ্রামে এ ধরনের প্রদর্শনী খুব একটা হয় না। প্রদর্শনীতে প্রযুক্তিজগতের হালফিল সব পরিবর্তনকে দেখার ও তার সঙ্গে সংলাপেরও সুযোগ তৈরি হয়। এর আগে ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারিতে আরও বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এ প্রদর্শনী। এর কিউরেটর শর্মিলি রহমান। কো-কিউরেটর জিহান করিম। প্রদর্শনীর মূল বক্তব্য যাকে ঘিরে এগোয় তা হলে, ‘অ্যালগোরিদম’। একে কী বলা যায়, ডিজিটাল কর্মপদ্ধতি? না, এতে সঠিক অর্থ ধরা পড়ে না। বরং ডিজিটাল স্মৃতিচিহ্ন বললে পুরো বিষয়টি বোঝা সহজ হয়।

ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা কীভাবে শিল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অথবা ডিজিটাল মাধ্যম কীভাবে শহরের বা গ্রামের একজন সাধারণ মানুষকেও তাঁর অদৃশ্য জালে বন্দী করেছে, প্রদর্শনী দেখতে দেখতে দর্শকের মনে এসব প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যায়। দেয়ালজুড়ে প্রজেক্টরে নানা দৃশ্যের প্রক্ষেপণ, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) হেডসেট কিংবা ল্যাপটপে খুলে রাখা চ্যাটজিপিটি সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না; বরং দর্শকের সামনে আরও নতুন সব প্রশ্নের উদ্রেক করে।

যন্ত্র আর নানা সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে মানুষের যে নির্ভরতা ও আসক্তি, তার কেন্দ্রেই আছে অ্যালগরিদম। এটি ব্যক্তি মানুষের স্ক্রল, লাইক, ভিউ সবকিছুই মনে রেখে ভোক্তাজগতে টেনে নেয়। তার সামনে হাজির করে এক আসক্তির জগৎ। আর এসবের সঙ্গে পৃথিবীর পরিবেশ আর গ্রামীণ জীবনও যেন জড়িয়ে যায়।

‘অ্যালগোরিদমিক বডিজ’ শিরোনামে চট্টগ্রামের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ গ্যালারিতে চলছে ডিজিটাল মাধ্যমের দৃশ্যশিল্পের প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া একটি শিল্পকর্ম
প্রথম আলো

ওয়ালিদ সাদ্দাম নামের একজন শিল্পী খুব কৌশলে কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টারে পানির ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের জীবনে পানির সংকটের সম্পর্ক তুলে এনেছেন। ‘ইউ আর লাইক মি টু’ শিরোনামে কাজটিতে ইনস্টলেশন, কৃত্রিম বুদ্ধমত্তা, ভিডিও ইলিউশন ব্যবহার করা হয়েছে। দর্শককে সংলাপে টেনে আনার জন্য একটি পানিভর্তি কলস আর গামলা রেখেছেন তিনি। গামলার ওপর বিভিন্ন দৃশ্যচিত্র প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে ক্রমাগত। কলসের কাছে বুদ্ধিমান ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘অ্যালেক্সার’ মতো কোনো প্রশ্ন রাখলেই সেটি জবাব দিচ্ছে, ‘আরে রাখেন, পানি কই, পানি দেন পানি।’

দৃশ্যশিল্প, আলোকচিত্র, স্থাপত্য, সংগীত, গবেষণা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন আটজন শিল্পী। তাঁরা হলেন দীপ্তি দত্ত, ফাহিম হাসিন, জয়ন্তী রায়না, নাজনীন আহমেদ, রাজীব দত্ত, সাদিয়া মারিয়াম, সৌম্য সাহা ও ওয়ালিদ সাদ্দাম।

‘ইউ আর লাইক মি টু’ শিরোনামে কাজটিতে ইনস্টলেশন, কৃত্রিম বুদ্ধমত্তা, ভিডিও ইলিউশন ব্যবহার করা হয়েছে। দর্শককে সংলাপে টেনে আনার জন্য একটি পানিভর্তি কলস আর গামলা রেখেছেন তিনি। গামলার ওপর বিভিন্ন দৃশ্যচিত্র প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে ক্রমাগত। কলসের কাছে বুদ্ধিমান ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘অ্যালেক্সার’ মতো কোনো প্রশ্ন রাখলেই সেটি জবাব দিচ্ছে, ‘আরে রাখেন, পানি কই, পানি দেন পানি।’

নাজনীন আহমেদের ‘অলরেডি অ্যাগ্রিড’ এর কথা আগেই বলেছি। তিনি ডিজিটাল সম্মতির ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কোনো ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সময় শর্তাবলি না পড়েই আমরা অনেক সময় ‘সম্মতি’ দিয়ে দিই। অর্থাৎ, সম্মতি আর সচেতন সিদ্ধান্ত নয়; ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রবেশের একটি স্বয়ংক্রিয় শর্ত। একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্বে নজরদারি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়টিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন নাজনীন।

‘অ্যালগোরিদমিক বডিজ’ শিরোনামে চট্টগ্রামের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ গ্যালারিতে চলছে ডিজিটাল মাধ্যমের দৃশ্যশিল্পের প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া একটি শিল্পকর্ম
প্রথম আলো

দীপ্তি দত্তের ‘দ্য বডি ইন পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট’ কাজটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের চেহারা ও বাস্তবতার ফারাক দেখিয়ে দেয়। ২০২৩ সাল থেকে করা গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি এ প্রকল্পের শুরু নেত্রকোনার একটি গ্রামে। শিল্পী কয়েকজন মানুষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল, সেলফি, অনলাইনে প্রকাশিত পারিবারিক ছবি এবং পারিবারিক সংরক্ষণে থাকা পুরোনো ছবি সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে ফেসবুকের জীবন ও বাস্ত জীবনের তুলনা করেছেন। দেখিয়েছেন ফারাকটুকু।

রাজীব দত্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দর্শকের সংযোগ ঘটিয়ে দেন। ‘চ্যাটজিপিটি’ এখানে মূল চরিত্র। সে কীভাবে ব্যক্তি হয়ে ওঠে, মানুষের মোকাবিলা করে তা একটি ল্যাপটপে দেখিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া একটি ট্রানজিস্টরে প্রযুক্তিজগতের বিভিন্ন শব্দ বাজিয়েছেন একটানা। সেখানে আইবিএম ডেক্সটপ থেকে শুরু করে নেটফ্লিক্স নানা পরিচিত অনুসঙ্গের শব্দ পায় দর্শক। আদতি যুগের ট্রানজিস্টর আর আধুনিক প্রযুক্কির এই সহাবস্থান যেন দারুণ শ্লেষ ছুড়ে দেয়।

প্রদর্শনী দেখতে দেখতে দুই তরুণ দর্শকের কথোপকথন কানে কানে আসে। এআই, পৃথিবীর ভবিষ্যৎ আর এলন মাস্কের কথা শোনা যাচ্ছিল তাদের আলাপে। মনে হলো যা করতে চেয়েছেন শিল্পীরা এই কথোপকথন তো তারই অংশ। প্রদর্শনীটি আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে এটি।