ছেলের মৃত্যুর খবরের ২০ মিনিট পর জানলেন, নাতনিও নেই
মুঠোফোনে প্রথমে খবর পান, সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলের মৃত্যু হয়েছে। ২০ মিনিট আবার ফোন করেন একজন। বলেন, তাঁর দেড় বছর বয়সী নাতনিও আর বেঁচে নেই। পরপর দুটি মৃত্যুসংবাদ শুনে বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন আবদুস সাত্তার (৬৫)। ছেলে আর নাতনির জন্য এখন তাঁর আহাজারি থামছেই না।
আবদুস সাত্তারের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়নের মলেয়াবাদে। গত শুক্রবার রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর ছেলে মো. দেলোয়ার (৩১) ও দেড় বছর বয়সী নাতনি ওয়াসিফা জান্নাতের। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন দেলোয়ারের স্ত্রী রেশমী আক্তার।
দেলোয়ার ও তাঁর মেয়ে ওয়াসিফার মৃত্যুতে দিনরাত আহাজারি চলছে তাঁদের বাড়িতে। বিলাপ করতে করতে দেলোয়ারের মা কামরুন্নাহার বেগম (৫৫) কিছু সময় পরপর জ্ঞান হারাচ্ছেন।
গতকাল রোববার দুপুরে মলেয়াবাদ গ্রামের বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, দূর থেকে ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। দুর্ঘটনায় নিহত দেলোয়ারের ঘরে শোকাহত স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। দেলোয়ারের বাবা আবদুস সাত্তার ও মা কামরুন্নাহারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তবে কিছুতেই দুজনের আহাজারি থামছে না। কান্না করতে করতে বারবার ছেলে ও নাতনির কথা বলছিলেন দুজন।
আহাজারি করতে করতেই আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোবাইলে কল দিয়ে একজন প্রথমে দুর্ঘটনার বিষয়টা জানাইছে। বলছে, আমার ছেলে মারা গেছে। আমরা সেখানে ছুটে যাচ্ছিলাম। ২০ মিনিট পর আবার ফোন এল। বলল, আমার নাতনিটাও আর বেঁচে নেই। বউমাকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হইছে।’
চোখের পানি মুছতে মুছতে আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমার বউমা তার স্বামী-মেয়েকে হারাল। তাকেও আইসিইউতে রাখছে। জানি না, কী হয়। এভাবে ছেলে-নাতনিকে ফেলে আমরা কীভাবে থাকব।’
দুর্ঘটনায় নিহত দেলোয়ার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। শুক্রবার রাতে স্ত্রী রেশমি আক্তার, দেড় বছর বয়সী মেয়ে ওয়াসিফা জান্নাতকে নিয়ে অটোরিকশায় করে স্থানীয় কেরানীহাট স্টেশনে আয়োজিত একটি মেলায় যাচ্ছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় নিহত দেলোয়ার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। শুক্রবার রাতে স্ত্রী রেশমি আক্তার, দেড় বছর বয়সী মেয়ে ওয়াসিফা জান্নাতকে নিয়ে অটোরিকশায় করে স্থানীয় কেরানীহাট স্টেশনে আয়োজিত একটি মেলায় যাচ্ছিলেন। দেলোয়ারের এক বন্ধুর পরিবারও সঙ্গে ছিল। অটোরিকশাটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়ার জাফর আহমদ চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ এলাকায় পৌঁছালে সেখানে একটি মিনিবাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দেলোয়ারের। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে মেয়ে ওয়াসিফাকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। দেলোয়ারের স্ত্রী রেশমি আক্তার বর্তমানে নগরের একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর গাড়ি ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলা
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যুর পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মহাসড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে সাতকানিয়া থানার পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গেলে তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। এ ছাড়া লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের তিন সদস্য আহত হন। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করেন। এ সময় পুলিশের একটি শটগান ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় ছিনিয়ে নেওয়া শটগান উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সাতকানিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহেদ হোসেন বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় পরদিন শনিবার মামলা করেছেন। মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।