রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন পাশাপাশি, সে ঘুম ভাঙল না তাঁদের

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পাহাড় ধসের মাটির নিচে চাপা পড়া ঘর। আজ সকালে তোলাছবি সংগৃহীত

ত্রিপলের ছাউনির ছোট্ট একটি ঘরের মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় চারজন নারী ও শিশুর মরদেহ। শরীর কম্বল ও গামছা দিয়ে মোড়ানো। পাশে দাঁড়িয়ে মরদেহ দেখছিলেন বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো এক নারী কাঁদছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘রাতে ঘুমিয়ে ছিল একসঙ্গে। সে ঘুম ভাঙল না তাদের।’ জানা গেল, দেড় বছর আগে আরাকান আর্মির গুলি–বোমা থেকে বাঁচতে পরিবারটি বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পালিয়ে এসেছিল। এরপর ঘর করেছিল পাহাড়ের ঢালে।

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরে আজ সোমবার সকালটা ছিল শোক আর আতঙ্কের। ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে কক্সবাজারের তিনটি আশ্রয়শিবিরে আটজন নিহত হন। গতকাল রোববার দিবাগত রাত একটা থেকে তিনটার মধ্যে বালুখালী, কুতুপালং ও জামশিয়া আশ্রয়শিবিরের চারটি স্থানে পৃথকভাবে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বালুখালী শিবিরেই এক পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু হলো। নিহত ব্যক্তিরা হলেন রোহিঙ্গা আবদুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উন্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩); উন্মে হাবিবার দুই ছেলে মো. রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।

আজ সকালে বালুখালী ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ভূমিধসে ক্যাম্পের সি-১১ নম্বর ব্লকের ১০-১৫টি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে ও ঢালে নির্মাণ করা হয়েছিল ঘরগুলো। প্রবল বর্ষণে পাহাড়ে মাটি আলগা হয়ে ঘরগুলো চাপা দিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা সকালে উদ্ধারকাজ চালানোর পর সেখানে এখনো ধ্বংসের চিহ্ন রয়ে গেছে।

ঘটনাস্থলে ছিলেন রোহিঙ্গা নেতা কামাল আহমদ। তিনি জানালেন, দুর্ঘটনার পর আবদুর রাজ্জাকসহ বাড়ির পুরুষ সদস্যদের খোঁজ মিলছে না। তাঁর দুই মেয়ে ও দুই নাতি মারা গেছে। তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

কামাল আহমদ বলেন, আবদুর রাজ্জাকের বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিকদারপাড়ায়। দখলদার আরাকান আর্মির নিপীড়নের শিকার হয়ে তিনি দেড় বছর আগে পরিবার নিয়ে নাফ নদী অতিক্রম করে টেকনাফ পালিয়ে আসেন। সেখান থেকে উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরে ঢুকে রোহিঙ্গাদের বাড়িতে অবস্থান নেন কিছুদিন। সরকারিভাবে থাকার জায়গা বরাদ্দ না পেয়ে রাজ্জাকের দুই মেয়ে বালুখালী আশ্রয়শিবিরের সি-১১ ব্লকের একটি পাহাড়ের নিচের ত্রিপলের ছাউনির ঝুপড়ি ঘরে বসতি করেন। গতকাল দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই মেয়েসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেও বাঁচতে পারলেন না তাঁরা।

চাপা পড়া মানুষজনের সন্ধানে মাটি সরানোর চেষ্টা করছেন রোহিঙ্গারা। আজ সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরে
ছবি: সংগৃহীত

পাহাড় কেটে গড়ে তোলা বালুখালী আশ্রয়শিবিরে ৯ বছর ধরে অবস্থান করছেন রাখাইন রাজ্যের অন্তত ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। বেশির ভাগ বসতি পাহাড়ের ঢালুতে, বাঁশ-কাঠ ও ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে তৈরি। গত দেড় বছরে এই আশ্রয়শিবিরে নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে অন্তত পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা আত্মীয়স্বজনের ঘরে গাদাগাদি করে থাকছেন।

উখিয়ার কুতুপালং, মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, টেকনাফের নয়াপাড়া, জাদিমুরা, শালবাগানসহ বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে অবস্থান করছেন নতুন আসা আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের অনেকে আশ্রয়শিবিরে থাকার ঘর বরাদ্দ না পেয়ে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে বসতি করছেন।

মধুরছড়া আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা ছৈয়দ নুর বলেন, গতকাল সকাল থেকে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। তাতে পাহাড়ে বড় বড় ফাটল ধরছে। বৃষ্টির পানি সেই ফাটলে ঢুকে মাটি ধসে পড়ছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানির স্রোতের সঙ্গে ভূমিধসের মাটি চাপা পড়ে রোহিঙ্গাদের বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চাপা পড়া মানুষজনকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের তৎপরতা। আজ সকালে বালুখালী আশ্রয়শিবিরে
ছবি: সংগৃহীত

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, রোববার দিবাগত রাত একটা থেকে সাড়ে তিনটার মধ্যে উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামশিয়া আশ্রয়শিবিরে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী–শিশুসহ অন্তত ৮ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও দুজন। এর মধ্যে বালুখালী আশ্রয়শিবিরে এক পরিবার চারজন নারী–শিশু ছাড়াও জামতলি আশ্রয়শিবিরের ( ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে ভূমিধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) ও ছেলে মোহাম্মদ আনাস (৪) নিহত হন।

রোহিঙ্গা নেতা আকতার কামাল বলেন, রাত দেড়টার দিকে জামতলি আশ্রয়শিবিরে ভারী বর্ষণে পাহাড়ের খণ্ড ধসে পড়ে কামাল হোসাইনের বসতঘর চাপা দেয়। তখন পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। স্থানীয় রোহিঙ্গারা মাটি সরিয়ে এক পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরিবারের আরও দুই সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

রাত দুইটার দিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে (ক্যাম্প-৭) ডি-৭ ব্লকে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় মো. একরাম (৭) নামে আরেক শিশুর মারা গেছে। সে ওই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা রশিদ উল্লাহর ছেলে। এ ছাড়া কক্সবাজার শহরেও ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আজ ভোরে পাহাড়ধসের ঘটনায় শহরের পাহাড়তলীর ছাত্তারঘোনা এলাকায় আলী আকবর নামেন এক ব্যক্তি মারা গেছেন। আহত হয়েছেন তাঁর পরিবারের দুই সদস্য।

আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২৬৭ মিলিমিটার। আরও দুই দিন ভারী বর্ষণ হতে পারে জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, ভারী বর্ষণে আশ্রয়শিবিরের পাশাপাশি কক্সবাজার শহর ও আশপাশের পাহাড়েও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

আশ্রয়শিবিরের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনা হচ্ছে জানিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে আশ্রয়শিবিরের ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। এক রাতেই একাধিক ভূমিধসের ঘটনায় নারী–শিশুসহ আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যুর ঘটনা মর্মান্তিক। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একটি পরিবার এসেছে দেড় বছর আগে, যদিও তাঁদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি।

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আশ্রয়শিবিরে অতি ঝুঁকিতে থাকা অন্তত এক হাজার রোহিঙ্গাকে ইতিমধ্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে। আরও কয়েক হাজারকে অবস্থা বুঝে সরিয়ে আনা হবে। প্রাণহানি ঠেকাতে আশ্রয়শিবিরে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।