জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে বরিশাল ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গ্রামটি অবস্থিত। ঢাকা-রংপুর জাতীয় মহাসড়ক থেকে গ্রামটির দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার। গত বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ২০ শতক জায়গাজুড়ে কয়লা তৈরির কারখানা। চারদিকে উঠতি আমন ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি।

স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেন, বাসুদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান যৌথভাবে কয়লা তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছেন। দেড় মাস ধরে এখানে গাছের গুঁড়ি দিয়ে কয়লা তৈরি হচ্ছে। কারখানায় রয়েছে সাতটি চুল্লি। খুলনা থেকে শ্রমিক নিয়ে এসে কাজ করা হচ্ছে। তিন ফসলি জমিতে মাটি ভরাট করে এ কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে।

গাছ কাটা ও তা জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উপরন্তু, কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।
সৈয়দ ফরহাদ হোসেন, রংপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক

সরেজমিনে দেখা যায়, ইট দিয়ে চুল্লি বানিয়ে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। চুল্লিতে গাছের গুঁড়ি পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করা হচ্ছে। চুল্লির চারদিকে রাখা গাছের গুঁড়ি ও শুকনা কাঠ-লাকড়ি। মোট সাতটি চুল্লির মধ্যে দুটি চুল্লিতে আগুন জ্বলছে। কালো ধোঁয়ায় চারদিক ছেয়ে গেছে। চারপাশে বিভিন্ন আকারের গাছের গুঁড়ি রাখা হয়েছে। প্রতিটি চুল্লিতে ১৫০ মণ কাঠ ফেলে আগুন দেওয়া হচ্ছে। এক পাশে চুল্লির মুখ খোলা। সেদিক দিয়ে গাছের গুঁড়ি, লাকড়ি দেওয়া হয়। খোলা মুখে আগুন দিয়ে সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কারখানার মালিকেরা বলেন, এক মণ খড়ি পুড়িয়ে পাঁচ-ছয় কেজি কয়লা পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত ৯০ মণ কয়লা বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি চুল্লিতে প্রতি দফায় ২০০ থেকে ৩০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। ৮ থেকে ১০ দিন পোড়ানোর পর চুলা থেকে কয়লা বের হয়। পোড়ানো কয়লা ঠান্ডা করে ব্যবসার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রেতাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রতি মণ লাকড়ি ১৩০ টাকায় কিনে প্রতি মণ কয়লা ৮০০ টাকায় বিক্রি করেন।

কারখানার মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, তাঁদের কারখানায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেই। তাঁরা মাত্র দেড় মাস আগে কাজ শুরু করেছেন। পরিবেশের ছাড়পত্র ও প্রশাসনের অনুমতির জন্য আবেদন করবেন।

বাসুদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা রফিক ইসলাম বলেন, চারপাশে বাড়িঘর আর ফসলি জমি। এর মধ্যে কীভাবে এ রকম একটা কারখানা হয়? প্রশাসন এগুলো দেখভাল করছে না। সারাক্ষণ কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। ধোঁয়ার কারণে বয়স্ক আর শিশুরা সব সময় কাশছে। তরুণ-যুবকদেরও একই অবস্থা। এভাবে মানুষ থাকে কীভাবে?

স্থানীয় কৃষকেরা বলেন, ধানগাছ বড় হচ্ছে। এর মধ্যে কয়লা তৈরির কারখানার কালো ধোঁয়ায় গাছ চিটচিটে হয়ে গেছে। গাছের পাতা হাত দিয়ে ঘষা দিলে হাত কালো হয়ে যায়। এ অবস্থায় ফলন ঠিকমতো পাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, কয়লা কারখানার চুল্লি পর্যাপ্ত উঁচু না হলে কালো ধোঁয়ায় উঠতি আমনসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

বরিশাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়লা কারখানার চুল্লির কারণে এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান বলেন, কাঠ দিয়ে কয়লা তৈরির বিষয়টি শুনেছেন। ওই সব কারখানার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।