লিবিয়ায় আটকে নির্যাতন

মাদারীপুর সদরের ১৫ তরুণ ৯ মাস আগে দেশ ছাড়েন। লিবিয়া আটকে রেখে মুক্তিপণের দাবিতে তাঁদের বেদম মারধর করা হচ্ছে।

  • ইতালি পাঠানোর কথা বলে দালাল চক্র প্রথমে ৭–৮ লাখ টাকা নেয়।

  • এরপর লিবিয়ায় আটকে রেখে মুক্তিপণ হিসেবে আরও কয়েক লাখ টাকা নেয়।

  • কয়েক দফা টাকা দিয়েও ওই তরুণেরা মুক্তি পাচ্ছেন না।

মাদারীপুর জেলার মানচিত্র

মাদারীপুর সদর উপজেলার দুর্গাবর্দী এলাকার মনির হাওলাদার ও মুরশিদা বেগম দম্পতির ছেলে তমাল হাওলাদার (১৮)। প্রায় ৯ মাস আগে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার জন্য দেশ ছেড়েছিলেন তমাল। কিন্তু ইতালি তিনি আর পৌঁছাতে পারেননি। এর আগেই লিবিয়ায় বাংলাদেশি দালালেরা তাঁকে আটকে রেখে তাঁর মা–বাবার কাছে মুক্তিপণ দাবি করছে। মুক্তিপণের আড়াই লাখ টাকা না দেওয়ায় তাঁর ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে।

মুঠোফোনে ভিডিও কলে একমাত্র ছেলের ওপর নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করার দৃশ্য দেখে তা মানতে পারছেন না তমালের মা-বাবা। তাঁরা ছেলেকে রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। ছেলেকে ফিরে পেতে সরকারের কাছে সহায়তা চাইছেন। এ বিষয়ে তমালের মা মুরশিদা বেগম বলেন, ‘আমার পোলাডা তিন মাস ধরে বন্দী। দালালেরা কইছিল, কাউরে কিছু কইলে ওরা আমার পোলারে মাইরা ফালাইবে। তাই ভয়ে এত দিন কাউরে কিছু বলি নাই। দফায় দফায় ১৫ লাখ টাকা দিছি। কিন্তু ওরা আমার পোলারে ছাড়ে নাই। এখন তারা (দালালরা) কইতাছে, মুক্তিপণের আড়াই লাখ টাকা দিতে। দুই দিনের মধ্যে টাকা না পাঠাইলে ওরা আমার বাজানরে মাইরা ফালাইবে। লাশের ছবি পাঠাইবে বইলা ঘোষণাও দিছে। এখন আমি কী করুম? কার কাছে যামু? টাকাই বা কই পামু।’

তমালের মতো দালালের প্রলোভনে অবৈধভাবে ইতালি যাত্রা করে দুর্গাবর্দী এলাকার ১৪ তরুণও পড়েছেন মহাবিপদে। বাংলাদেশি দালালেরা মুক্তিপণের জন্য লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে তাঁদের ওপরও ভয়াবহ নির্যাতন চালাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথমে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকার তরুণদের টার্গেট করে দালাল চক্র। এরপর দালাল চক্রের সদস্যরা ওই তরুণদের মা–বাবার কাছে গিয়ে ইতালি পাঠানোর জন্য সাত–আট লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করে। এরপর ওই টাকা নিয়ে তাঁরা তরুণের ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে প্রথমে লিবিয়া নিয়ে যায়। সেখানে থাকা বাংলাদেশি দালালদের একটি চক্র তাঁদের আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করে। কিন্তু একবার, দুবার এমনকি অনেক সময় তিনবার মুক্তিপণের টাকা দিলেও অনেকে মুক্তি পান না। কেউ কেউ সব মিলিয়ে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ করার পরও মুক্তি পাচ্ছেন না।

স্থানীয় ও জনপ্রতিনিধিদের সূত্র জানায়, সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের দুর্গাবর্দী এলাকা থেকে ১৫ জন তরুণ ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে ৯ মাস আগে দেশ ছাড়েন। তাঁরা সবাই এখন লিবিয়ায় বাংলাদেশি দালালদের হাতে বন্দী। ওই ১৫ জন তরুণ হলেন লুৎফর ব্যাপারীর ছেলে আল আমিন ব্যাপারী, মোতালেব খানের ছেলে ইয়াসিন খান, মনির হাওলাদারের ছেলে তমাল হাওলাদার, আলী হোসেন ব্যাপারীর ছেলে ইমন ব্যাপারী, তাজমুল চৌকিদারের ছেলে শান্ত চৌকিদার, কালাম ফকিরের ছেলে মেহেদী ফকির, হুমায়ন ব্যাপারীর ছেলে সৌরভ ব্যাপারী, ফারুক হাওলাদারের ছেলে ফারদিন হাওলাদার, এসকান ব্যাপারীর ছেলে হাসান ব্যাপারী, হাবিব খানের ছেলে আল আমিন খান, মোস্তফা মাতবরের ছেলে সাব্বির মাতবর, মনির খানের ছেলে নাঈম খান, শাহ্আলম মুন্সির ছেলে হৃদয় মুন্সি, ওহাব আলী ব্যাপারীর ছেলে হারুন ব্যাপারী ও এহসাক হাওলাদারের ছেলে রুবেল হাওলাদার।

গত রোববার বিকেলে তমালদের বাড়িতে গিয়ে যায়, তমালের মা মুরশিদা বেগম ও খালারা চুপচাপ বসে আছেন। তমালের মায়ের হাতে মুঠোফোন। বারবার তিন মুঠোফোন দেখছেন আর ইমো অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশি একটি নম্বরে বারবার কল করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সন্তানকে ফিরে পেতে সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন জানাচ্ছেন বারবার।

মুরশিদা বেগমদের প্রতিবেশী আলী হোসেন ও নাহার বেগম দম্পতির ছেলে ইমন ব্যাপারীকেও (১৯) লিবিয়া মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করছে দালালেরা। ইমনে মা নাহার বেগম বলেন, ‘দালাল গো তিন দফায় ১৫ লাখ টাকা দিছি। এরপরেও আমার পোলারে বিক্রি করে দিছে।’

লিবিয়ায় বিভিন্ন স্থানে বন্দী থাকা ওই তরুণদের স্বজনেরা বলেন, দালাল চক্রের নেতৃত্বে আছেন দুর্গাবর্দী এলাকার নুরুল আমিন ও তাঁর স্ত্রী নাজমিন আক্তার। এই দম্পতির দুই ছেলে থাকেন ইতালি।

নুরুল আমিন ও তাঁর স্ত্রী নাজমিন আক্তারকে বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশী শাহ আলম ব্যাপারী বলেন, তাঁরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি মনোয়ার হোসেন চৌধুরী পবলেন, ‘সন্তানদের নিরাপত্তার ভয়ে দালালদের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করতে চান না। এ বিষয়ে নির্যাতনের শিকার তরুণের পরিবারগুলোর কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলেই আমরা ব্যবস্থা নেব।’