ভূগোলের শিক্ষক পড়ান কৃষিশিক্ষা, রসায়নের শিক্ষক নেই

কেশবপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ফটক। সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো
দেশের অনেক সরকারি কলেজ চলছে নানা ধরনের সংকট নিয়ে। কোথাও শিক্ষকের পদ শূন্য, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ চলছে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে। এ ছাড়া রয়েছে শিক্ষার্থীদের আবাসনের সমস্যা। কোথাও পাঠাগার নেই, থাকলেও প্রয়োজনীয় বই নেই। কোথাও আছে একাডেমিক ভবনের সমস্যা। সরকারি কলেজগুলোর এসব সংকট নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের এটি দ্বিতীয় পর্ব।

কৃষিশিক্ষা বিষয়ে দুজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও নেই একজনও। তাই কৃষিশিক্ষা পড়ান ভূগোলের শিক্ষক। আর চার হাজার শিক্ষার্থীর ইংরেজি ক্লাস নেওয়ার জন্য আছেন মাত্র একজন শিক্ষক। অথচ ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষক থাকার কথা ছিল তিনজন।

রসায়ন বিষয়ে শিক্ষকের পদ আছে দুটি, কিন্তু একজনও নেই। এইচএসএসি ও স্নাতক (ডিগ্রি) মিলিয়ে রসায়নবিজ্ঞান পড়তে হয় তিন শ শিক্ষার্থীকে। খণ্ডকালীন একজন শিক্ষক দিয়ে কোনোরকমে চলছে রসায়ন বিষয়ে পাঠদান।

যশোরের কেশবপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় সমস্যা হচ্ছে। এর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষসহ নানা সংকটও আছে।

কলেজটিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখার আওতায় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, ডিগ্রি পাস কোর্স সাতটি বিষয়ে স্নাতক (অনার্স) কোর্স চালু আছে। তবে এখানে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) নেই।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, নামে সরকারি কিন্তু সরকারি কোনো সুবিধার আওতায় আসেনি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের অপ্রতুলতা, আধুনিক ল্যাব না থাকাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত কেশবপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ চলছে কোনোরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমুছ সাকিব বলেন, তাদের কৃষিশিক্ষা বিষয়ে ক্লাস নেন ভূগোল বিভাগের শিক্ষক। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় তাদের খুব অসুবিধা হচ্ছে।

কেশবপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালে। বর্তমানে শিক্ষার্থীসংখ্যা ৪ হাজার ২৫১। ৮ একর ২৭ শতক জমির ওপরে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি। প্রতিবছরই এ কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা ও প্রকৌশল বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি করা হয়।

কলেজটির ইতিহাস বিভাগের প্রধান আবদুল হান্নান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হয়েছে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। কলেজের সবচেয়ে বড় সংকট শ্রেণিকক্ষ। একটি পুরোনো ভবনে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হয়। ভূগোল বিভাগের ওপর ছাদ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ে। একটু বৃষ্টিতেই ভবনে পানি উঠে যায়, তখন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বসতে পারেন না। সরকারি হওয়ার পরে মন্ত্রণালয়ে অবকাঠামোর প্রয়োজনের কথা জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো ভবন নির্মাণ করা হয়নি।

কলেজের নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে যশোরের শিক্ষা প্রকৌশলী ইলিয়াস আলী বলেন, ছয়তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি পাস হলে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, এ কলেজে ৬৫ জন শিক্ষক আছেন। শিক্ষকের ঘাটতি ১১ জন। কৃষিশিক্ষা ও রাসায়ন বিষয়ে কোনো শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের যে আধুনিক ল্যাব–সুবিধা থাকা দরকার, তার কিছুই নেই এখানে।

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আছেন পাঁচজন। অস্থায়ী ভিত্তিতে মাস্টার রোলে ১৬ জনকে বেতন দিয়ে প্রশাসনিক কাজ চালাতে হচ্ছে। সম্মান শ্রেণির সাতটি বিষয় কলেজে পড়ানো হয়। এগুলো হচ্ছে বাংলা, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ও ভূগোল। ভূগোল বিভাগের শিক্ষকেরা নেন কৃষিশিক্ষার ক্লাস। আর রসায়নের শিক্ষক না থাকায় খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কোনোরকমে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে পাঠদান। এতে সিলেবাস শেষ হলেও শিক্ষার গুণগত মান অর্জিত হচ্ছে না। আর ইংরেজি বিষয়ে ৪ হাজার ২৫১ শিক্ষার্থীর ক্লাস নেন একজন শিক্ষক। এ বিভাগে একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নেওয়া হয়েছে।

পাঠদানের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক আবু নাসের বিপ্লব। তিনি বলেন, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্লাস নিতে পারেন না। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ক্লাস নিলে পাঠদান সঠিকভাবে হয় না। খণ্ডকালীন এক শিক্ষক আছেন, তিনি ক্লাস নেন। তিনি খণ্ডকালীন বলে তাঁর এতটা দায় থাকে না।

ভূগোল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এনায়েত হোসেন। তিনি ছয় মাস পরে অবসরে যাবেন। ভূগোল বিভাগের শিক্ষক হয়েও কৃষিশিক্ষা পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান তিনি। এনায়েত হোসেন বলেন, এখন দুটি বিষয়ে পড়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মতো রাত জেগে নিজেকে পড়তে হচ্ছে। নিজে পড়ে রপ্ত করে তারপর ক্লাসে যেতে হচ্ছে। এতে তাঁর জন্য বাড়তি চাপ হয়ে যাচ্ছে।

কলেজটির অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামন প্রথম আলোকে বলেন, এ প্রতিষ্ঠান নামে সরকারি হয়েছে। নানা সংকটের বিষয়ে বারবার মন্ত্রণালয়ে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। কলেজে তেমন কোনো তহবিল নেই। তারপরও টাকা দিয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মাস্টার রোলে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নতুন জাতীয়করণ কলেজগুলোয় শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা রয়েছে।