সংরক্ষিত বনভূমিতে তরমুজখেত, ৫০০ ঝাউগাছ উপড়ে ফেলার অভিযোগ

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় এসব খননযন্ত্র দিয়ে ঝাউগাছ উপড়ে বেড়িবাঁধ তৈরি এবং জমিতে সীমানাপ্রাচীর তৈরি কাজ চলছিল। গতকাল রোববার দুপুরে দিকে উপজেলার কাউখালীর চরসাইনবোর্ড এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি বন্দোবস্ত নিয়ে তরমুজখেত করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ জন্য ৪০০ থেকে ৫০০ ঝাউগাছ উপড়ে মাটি কেটে বেড়িবাঁধ ও সীমানাপ্রাচীর তৈরি করা হয়েছে। এ ঘটনায় রাঙ্গাবালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বন বিভাগ।

পটুয়াখালী বন বিভাগের জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গাবালী উপজেলার বাসিন্দা আরিফ মীর, মানিক মোল্লা, সাব্বির মীরসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলার কাউখালীর চরসাইনবোর্ড এলাকার সংরক্ষিত বনভূমিতে প্রবেশ করেন। সেখানে ১০ হেক্টর জমিতে লাগানো ঝাউবাগানের গাছ খননযন্ত্র দিয়ে উপড়ে ফেলেন তাঁরা। এরপর তরমুজ চাষ করার জন্য মাটি কেটে বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং জমির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর দেওয়া হয়।

বন বিভাগ জানায়, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাধা দেন। তবে তাঁরা উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ওই জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন দাবি করে মাটি কাটা অব্যাহত রেখেছেন।

কাউখালী বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জালাল আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, কাউখালীর চরসাইনবোর্ড এলাকায় ২০২২ সালে ৩০ হেক্টর জমিতে ঝাউগাছ রোপণ করে বন বিভাগ। গত শনিবার বিকেলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ওই বনে প্রবেশ করে খননযন্ত্র দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ ঝাউগাছ উপড়ে ফেলেন। এরপর মাটি কেটে বেড়িবাঁধ তৈরি করে তরমুজখেত করার প্রস্তুতি নেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাধা দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা বাধা অমান্য করে মাটি কাটা অব্যাহত রাখেন। পরে জেলা কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে শনিবার রাতে তাঁদের বিরুদ্ধে রাঙ্গাবালী থানায় জিডি করা হয়।

কাউখালীর চরসাইনবোর্ড এলাকায় ২০২২ সালে ৩০ হেক্টর জমিতে ঝাউগাছ রোপণ করে বন বিভাগ। গত শনিবার বিকেলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ওই বনে প্রবেশ করে খননযন্ত্র দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ ঝাউগাছ উপড়ে ফেলেন। এরপর মাটি কেটে বেড়িবাঁধ তৈরি করে তরমুজখেত করার প্রস্তুতি নেন।
জালাল আহমেদ, কাউখালী বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, একই ব্যক্তিরা ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ওই বনাঞ্চলে খননযন্ত্র দিয়ে প্রায় ২৫ হাজার ঝাউগাছ নষ্ট করে মাটি কেটে বেড়িবাঁধ করেছিলেন। এ ঘটনায় বনবিভাগ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আসামি করে রাঙ্গাবালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। মামলাটি এখনো চলমান।

বনাঞ্চলের গাছ কাটা এবং বনের মাটি দিয়ে বেড়িবাঁধ করার বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত আরিফ মীরের সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো। তাঁর ভাষ্য, বন বিভাগ যে জমিকে বনভূমি দাবি করছে, সেটি তাঁরা উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে বৈধভাবে মাটি কেটে তরমুজখেত করছেন। বন বিভাগ অহেতুক তাঁদের সঙ্গে ঝামেলা করছে বলে তিনি দাবি করেন।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে রাঙ্গাবালী উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের তহশিলদার জাহিদুল ইসলাম বনাঞ্চলকে খাসজমি উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। এরপর রাঙ্গাবালীর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব দাশ পুরকায়স্থ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে ওই বনাঞ্চলের জমি খাস দেখিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নামে বন্দোবস্ত দেন। পরে এ ঘটনায় তহশিলদার জাহিদুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে রাঙ্গাবালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করে বন বিভাগ।

বিস্তৃত জমিতে তরমুজখেত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কয়েকজন
ছবি: প্রথম আলো

জেলা বন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া ওই বন্দোবস্ত বাতিল চেয়ে গত ৩ আগস্ট ও ১৫ অক্টোবর পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত চিঠি পাঠিয়েছেন পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান।

উপজেলা প্রশাসন যে বনভূমি বন্দোবস্ত দিয়েছে, সেটি মূলত সংরক্ষিত বনাঞ্চল বলে দাবি করেন জাহিদুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য জেলা প্রশাসনকে তাঁরা দুইবার চিঠি দিয়েছেন। তবে জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা তিনি জানেন না বা জেলা প্রশাসন থেকে তাঁকে জানানো হয়নি।

বন বিভাগ, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তাঁদের দাবির স্বপক্ষে থাকা কাগজপত্র নিয়ে কার্যালয়ে আসতে বলেছি। কাগজপত্র যাচাই করে জমিটি বন বিভাগের হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাজমুল হাসান, রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা

এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন বিভাগ, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তাঁদের দাবির স্বপক্ষে থাকা কাগজপত্র নিয়ে কার্যালয়ে আসতে বলেছি। কাগজপত্র যাচাই করে জমিটি বন বিভাগের হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে জেলা প্রশাসক চৌধুরী আশরাফুল করিমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল কাইয়ুমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বন বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসনকে দেওয়া চিঠিটি আজ তাঁর হাতে এসেছে। রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এবং তদন্ত করে জমিটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।