কুমিল্লায় চুরির অভিযোগে দুই যুবককে ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল

কুমিল্লায় যুবককে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হচ্ছেছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

চুরির অভিযোগে দুই যুবককে আটক করে রশি দিয়ে বাঁধা হয়েছে। এরপর একের পর এক ইলেকট্রিক শক দিয়ে চালানো হচ্ছে নির্যাতন। গত শনিবার এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে (ভাইরাল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। তবে পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ওই দুই যুবকই পেশাদার ‘চোর’।

ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার সকালে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের মনশাসন গ্রামে। ঘটনার দিন ওই দুই যুবক মসজিদের ব্যাটারি চুরি করতে গেলে বিষয়টি টের পান স্থানীয় বাসিন্দারা। এরপর দুজনকে আটক করে মারধর ও ইলেকট্রিক শক দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় কয়েকজনের বরাতে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার মো. নাঈম (২৫) মনশাসন গ্রামের বাসিন্দা। অপর যুবক নাঈমের সহযোগী। তিনি কুমিল্লা শহরের বাসিন্দা। তবে ২৪ বছর বয়সী ওই যুবকের বিস্তারিত নাম-পরিচয় জানতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর থেকে নাঈমকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের নির্যাতনের ভিডিওটি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ঘটনার তিন দিন পার হলেও এখনো এ নিয়ে তাঁরা থানায় কোনো অভিযোগও করেননি।

ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, রশি দিয়ে দুই যুবককে বেঁধে মারধর করাসহ ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। দুই যুবকের মধ্যে একজন বাধা হয় একটি খুঁটির সঙ্গে। একাধিক ব্যক্তি তাঁদের নির্যাতন করছেন। পাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন, সবাই ঘটনাটি দেখছেন, কিন্তু কিছুই বলছেন না। ইলেকট্রিক শক দেওয়ামাত্রই দুই যুবক চিৎকার করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। তাঁদের একজন চিৎকার করতে করতে কানে ধরে ক্ষমা চাইলেও কেউ তাঁদের বাঁচাতে আসেননি। এভাবে নির্যাতন চালানো অবস্থায় ভিডিও শেষ হলেও শেষ পর্যন্ত ওই দুই যুবককে রক্ষা করতে কাউকে এগিয়ে আসতে বা বাধা দিতে দেখা যায়নি।

সোমবার বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করেও নির্যাতিত দুই যুবকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার দিন থেকেই নাঈম আত্মগোপনে রয়েছেন।

মনশাসন গ্রামের বাসিন্দা বেলায়েত হোসেন বলেন, শুক্রবার ভোরে মনশাসন জামে মসজিদ থেকে মাইকের ব্যাটারি চুরির সময় নাঈম ও তাঁর সহযোগীকে আটক করেন এলাকার লোকজন। এ সময় তাঁদের বেঁধে মারধর করা হয়। তখন এলাকার দুজন তাঁদের ইলেকট্রিক শক দেন। তবে ওটা গুরুতর কোনো ইলেকট্রিক শকার ছিল না। কিছুক্ষণ তাঁদের শক ও মারধরের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর তাঁরা এলাকা থেকে পালিয়ে গেছেন। এ ছাড়া নাঈম এলাকায় পেশাদার চোর হিসেবে পরিচিত। তাঁর যন্ত্রণায় মানুষ অতিষ্ঠ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মনশাসন এলাকার বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটছিল। এ নিয়ে একই গ্রামের মো. নাঈমকে সন্দেহ করা হতো। নাঈমের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে অপরিচিত তাঁর সহযোগীরাও গ্রামে আসতেন। সর্বশেষ শুক্রবার মসজিদের ব্যাটারি চুরির সময় তাঁদের আটক করে মারধর করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

সোমবার বিকেলে কুমিল্লা কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুল আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ‘খবর পেয়ে শুক্রবার জুমার পর আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। তখন দুই শতাধিক মানুষ পুলিশকে দেখে উত্তেজিত হয়। তারা বলতে থাকে, পুলিশ কেন চোরের পক্ষে আসবে। তখন আমরা তাদের বলেছি, কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে। এরপর আমরা যখন আটক দুই যুবককে পুলিশের হাতে তুলে দিতে বলি, তখন গ্রামবাসী জানায়, তারা দুজনকে মারধর করে ছেড়ে দিয়েছে। এরপর এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে ওই দুই যুবক।’

ওসি তৌহিদুল আনোয়ার আরও বলেন, ‘গ্রামবাসীর এমন কথা শুনে আমরাও খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ওই দুই যুবক এলাকায় নেই। আর যেসব জিনিস দিয়ে শক দেওয়া হয়েছে, এগুলো গুরুতর কোনো শকার নয়। এরপরও এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। প্রাথমিকভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ওই যুবকেরা এলাকায় নিয়মিত চুরি করতেন। সর্বশেষ মসজিদের ব্যাটারি চুরি করতে গিয়েছিলেন তাঁরা।’