ক্ষমতায় গেলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করতে চান তারেক রহমান

ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ শনিবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় বড় মাঠেছবি: প্রথম আলো

এবারের নির্বাচন দেশকে পুনর্গঠন করার নির্বাচন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ শনিবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় বড় মাঠে বিএনপি আয়োজিত জনসভায় এ কথা বলেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। এখন দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে পুনর্গঠন করতে চাই। দেশকে খাদ্যে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই।’

দেশ পুনর্গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারেক রহমান বলেন, ‘বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। মা-বোনদের শিক্ষিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। এসব কাজ যদি করতে হয়, তাহলে এ দেশের যে মালিক জনগণ, সেই মালিকের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের পক্ষে কাজগুলো করা সম্ভব নয়। এ জন্য এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি আপনাদের সহযোগিতা চাচ্ছি, ধানের শীষে ভোট চাচ্ছি—যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি।’

আজ সকাল ১০টায় ঢাকা থেকে আকাশপথে নীলফামারীর সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান। বেলা ১১টায় সেখান থেকে হেলিকপ্টারে ঠাকুরগাঁওয়ে আসেন। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যোগ দেন সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের এই জনসভায়। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে জনসভায় ভাষণ শুরু করেন তিনি।

দীর্ঘ ২২ বছর পর ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা হওয়ার কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বহু বছর পর এই ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে আসতে পেরেছি। এ জন্য আল্লাহর কাছে হাজার কোটি শুকরিয়া। প্রতিবছর শীতের সময় ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ে আসতাম; গ্রামে গ্রামে যেতাম, উপজেলা–ইউপিতে যেতাম; দুস্থ মানুষের জন্য গরম কাপড় নিয়ে হাজির হতাম। আবার ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে এসে আমি দাঁড়িয়েছি। আজ এসেছি ভিন্ন পরিস্থিতি, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে।’

এর আগে তারেক রহমান ২০০৩ সালের ৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ ঠাকুরগাঁও এসেছিলেন। তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষের যে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, সেই অধিকার প্রয়োগ করবে মানুষ।

মঞ্চের পাশে জুলাই আন্দোলনে হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, এখানে যে মানুষগুলো বসে আছেন, তাঁরা নিজেদের স্বজন হারিয়েছেন। সেই স্বজনেরা বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের অবদানকে কখনো বৃথা যেতে দেওয়া যায় না।

দেশ গঠনে নারীদের অংশগ্রহণের গুরুত্বের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘নারীদের যদি কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে না পারি, তাহলে কোনোভাবেই দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। এ কারণে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা বিনা মূল্যে করে দিয়েছিলেন। আজ দেশের কোটি নারী শিক্ষায় আলোকিত হয়েছেন। এই মা-বোন, নারীদের আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে চাই।’

নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে গৃহিণী যাঁরা আছেন, তাঁদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। এই ফ্যামিলি কার্ডের অধিকারী হবেন এ দেশের মায়েরা। এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার পরিচালনা করতে পারেন—এ জন্য প্রতি মাসে একটা সহযোগিতা পৌঁছে দিতে চাই। এর ফলে তাঁরা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবেন।’

আরও পড়ুন

কৃষকদের জন্য আলাদা পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ ধানের শীষকে নির্বাচিত করলে, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করতে চাই। এনজিও থেকে দুস্থ মানুষ বিভিন্ন সময় যে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করেছেন—তা জনগণের পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে চাই। উত্তরাঞ্চল কৃষিপ্রধান এলাকা। আমরা চাই, এই এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে। কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত যত শিল্প-কলকারখানা আছে, সেসব এই এলাকায় গড়ে তুলতে চাই।’

নির্বাচনী জনসভায় প্রতিপক্ষ দলের বিপক্ষে কথা বলে জনগণের কোনো লাভ হবে না জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণ জানতে চান, তাঁরা যে আমাদের ভোট দেবেন আর আমরা তাঁদের জন্য কী করব। এই এলাকার মানুষের অনেকগুলো দাবি আছে। আমরা পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে চিনিকল, রেশম কারখানা, চা শিল্পকে আবার গড়ে তুলতে চাই। ঠাকুরগাঁওয়ে ক্যাডেট কলেজের দাবিটা পূরণে চেষ্টা করব। ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুরে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার গড়ে তুলতে চাই। যাঁরা আইটিতে কাজ করেন, তাঁদের জন্য আইটি পার্ক বা আইটি হাব গড়ে তুলতে চাই।’

বিএনপির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘মা-বোন ও শিশুদের জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গ্রামে গ্রামে হেলথকেয়ার নিযুক্ত করব। এখানে মেডিক্যাল কলেজের যে দাবি আছে, তা বাস্তবায়ন করব। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দেখব। বন্ধ বিমানবন্দরটিও চালু করার ব্যবস্থা করতে চাই।’

কেমন দেশ চান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশ ২০ কোটি মানুষের দেশ। বেগম খালেদা জিয়া এত নির্যাতনের পরেও বলতেন, এই দেশটি তাঁর প্রথম ও শেষ ঠিকানা। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। এ কারণে আমরা জনগণের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। জনগণের সমর্থন নিয়ে, জনগণের ভালোবাসা নিয়ে, জনগণের শক্তিতে বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে চাই। যে দেশে খেটে খাওয়া মানুষ নিরাপদে চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি-বাকরি করতে পারবে এবং যে বাংলাদেশের মা-বোনেরা নিরাপদে কাজ করতে পারবেন, মানুষজন ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা পাবে।’

একাত্তরে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করা হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালে আমরা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছি। এখন দেশকে গঠন করতে হবে, দেশকে তৈরি করতে হবে, দেশের অর্থনীতি-গণতন্ত্রকে মজবুত করে গড়ে তুলতে হবে।’

তারেক রহমান বলেন, এ দেশে হাজার বছর ধরে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে আসছে। আগামী হাজার বছরও প্রত্যেক ধর্মের মানুষ যেন শান্তিতে এ দেশে বসবাস করতে পারেন। যে যার যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাবে। প্রত্যেককে বিচার করা হবে এর ভিত্তিতে। ধর্ম দিয়ে তাঁকে বিচার করা হবে না।

বক্তব্য শেষে তারেক রহমান ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর-১ আসনের ধানের শীষের ছয় প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি সবাইকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে এসব প্রার্থীকে জয়ী করার আহ্বান জানান। সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাজ হলো আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত এদের দেখে রাখবেন। ১২ তারিখ নির্বাচিত হলে তাঁদের দায়িত্ব হবে ২৪ ঘণ্টা আপনাদের দেখে রাখা।’