মা-বাবার স্বপ্ন পূরণে মানবিক চিকিৎসক হতে চায় মারিয়া

ক্রেস্ট হাতে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস। জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন, সিরাজগঞ্জ, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: সোয়েল রানা

শনিবার সকাল। ঘড়িতে সময় তখন ৯টা ৫০ মিনিট। সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে কৃতী শিক্ষার্থীদের ভিড়। কারও হাতে ক্রেস্ট, কারও হাতে পত্রিকা। কেউ ব্যস্ত বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে।

এ ভিড়ের মধ্যেই বড় ভাই কামরুল হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে ছবি তুলছিল মারিয়া সুলতানা। মারিয়া পড়েছে রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছি বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে। ব্যবসায়ী শাহ আলম সরকার ও কোহিনূর দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান সে। তাঁদের স্বপ্ন, মেয়ে বড় হয়ে ভালো মানুষ হবে, ভালো চিকিৎসক হবে।

মা-বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চায় মারিয়া। বলল, ‘আমি সরকারি মেডিকেলে পড়তে চাই। ভবিষ্যতে মানবিক চিকিৎসক হতে চাই। মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য পরিশ্রম করে যাচ্ছি। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’

বড় ভাই কামরুল হাসানের সেলফিতে মারিয়া সুলতানা
ছবি: প্রথম আলো

শুধু মারিয়া নয়, এদিন সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছিল এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া এমন এক হাজারের বেশি কৃতী শিক্ষার্থী। প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছী উচ্চবিদ্যালয়ের তিন সহপাঠী ও বন্ধু করুনাময় মাহাতো, জিহাদ খান ও বায়েজিদ আকন্দ এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। ফল প্রকাশের পর তারা ভর্তি হয়েছে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে। আজ আবার বাড়ি থেকে একসঙ্গে এসেছে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একত্র হতে পেরে উচ্ছ্বসিত বন্ধুরা
ছবি: প্রথম আলো

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সাতসকালে সংবর্ধনায় বড় ভাইয়ের সঙ্গে এসেছে চৌহালী উপজেলার বেতিল হাইস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া আবদুল্লাহ ওয়াহিদ। সে বলে, অনুষ্ঠানে এসে অনেক দিন পর নতুন ও পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। অনুষ্ঠানে এসে আড্ডা, গানে খুবই ভালো লেগেছে।

ফটো জোনে ছবি তুলছিল শহরের সালেহা-ইসহাক সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মারিয়া বসরী ও নওশীন নূর এশা; কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেহজাবিন জান্নাত ও আতিয়া খাতুন এবং সবুজ কানন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাহিয়া খাতুন। ভিন্ন স্কুল থেকে পাস করলেও তারা বন্ধু। আজ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সবাই একত্র হতে পেরে উচ্ছ্বসিত।

শহরের মাছুমপুর এলাকা থেকে অভিভাবক মাছুমা রহমান সংবর্ধনায় এসেছেন একমাত্র সন্তান সামিহা আকন্দকে নিয়ে। মেয়ে সালেহা–ইসহাক সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এমন আয়োজনের জন্য প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানান মাছুমা রহমান। তিনি বলেন, এতে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হবে। একই আশাবাদ জানালেন মেয়ে মারিয়া সুলতানাকে নিয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসা মো. লিয়াকত আলী।

অতিথিদের সঙ্গে কুইজ বিজয়ী শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

‘থেমে গেলে চলবে না’

সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। সিরাজগঞ্জ বন্ধুসভার সভাপতি আবুল কাশেম ও কার্যনির্বাহী সদস্য মারুফা আক্তার অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি আরিফুল গণি।

অনুষ্ঠানে সব প্রতিকূলতা মাড়িয়ে কৃতী শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক শামীম হাসান। তিনি বলেন, পাগলা হাওয়ার তোড়ে প্রদীপ নিভু নিভু করলেও, কারও জীবন যেন পাগলা হাওয়ার তোড়ে নিভু নিভু না করে।

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লায়লা ফেরদৌস হিমেল বলেন, এসএসসিতে সেরা হয়ে থেমে গেলে চলবে না। সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। জীবন অনেক ছোট, জীবনের একটি মুহূর্তও যেন নষ্ট না হয়।

সিরাজগঞ্জ রাশিদাজ্জোহা সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহিদ হাসান দিপু শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ পার হয়ে এখানে এসেছ। এ সাফল্যের জন্য তোমাদের অভিনন্দন। জীবনের লক্ষ্য অর্জনে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। স্বপ্ন ছোঁয়ার জন্য পরিশ্রম করতে হবে।’

সংবর্ধনায় ছিল নাচ–গানসহ নানা আয়োজন
ছবি: প্রথম আলো

সংবর্ধনায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান প্রথম আলোর উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি। এ সময় তিনি বলেন, সত্যকে জানতে হবে, মা–বাবার কথা শুনতে হবে। মুখস্থবিদ্যা, মিথ্যা ও মাদককে ‘না’ বলতে হবে।

কৃতীদের মধ্যে বক্তব্য দেয় সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের সালেহা–ইসহাক সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারজানা আরেফিন, হৈমবালা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারিয়া সুলতানা।

সংবর্ধনার ফাঁকে ছিল নাচ, গানসহ নানা আয়োজন। জাদু পরিবেশন করেন সিরাজগঞ্জ বন্ধুসভার সহসভাপতি গোলাম রেজা-ই- রাব্বি। নৃত্য পরিবেশন করে সিরাজগঞ্জ বন্ধুসভার খুদে বন্ধুরা। কৃতী শিক্ষার্থী উপমা সাহা, সিরাজগঞ্জ বন্ধুসভার ম্যাগাজিন সম্পাদক আশীষ বিপ্লব, সদস্য বারেকুজ্জামান, তানজিলা খানম এবং ঢাকা থেকে আসা শিল্পী সাদিকুর রহমান গান পরিবেশ করেন।

শিল্পীদের গানে গলা মেলায় শিক্ষার্থীরা। নাচে-গানে উৎসবে পরিণত হয় অনুষ্ঠানস্থল। এ ছাড়া কুইজ প্রতিযোগিতা, প্রথম আলো এক্সপেরিয়েন্স জোনসহ নানা আয়োজনে মেতে ছিল শিক্ষার্থীরা। কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ জনের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পৌর শহরের জ্ঞানদায়িনী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আয়ুব আলী, শাহজাদপুরের সাতবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক খন্দকার ওমর ফারুক, রায়গঞ্জ উপজেলার সরকারি বেগম নূরুণনাহার তর্কবাগীশ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক ফজলুল হক খান, সিরাজগঞ্জ প্রথম আলো বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি প্রদীপ সাহা প্রমুখ।