থানা নেই, আছে ১৫০ বছরের ‘থানার বাজার’
মানুষের ভিড় কম। এদিক-ওদিক ঘুরে যে যাঁর মতো পণ্য কিনছেন। হঠাৎ করে বোঝার উপায় নেই—এটি একটি গ্রামীণ বাজারের সাপ্তাহিক হাট। তবু এটি যে গ্রামের হাট, সেই চেহারা একেবারে মুছে যায়নি। ছড়ানো-ছিটানো দোকান, মানুষের হাঁটাচলা এখনো আগের মতোই। নানা দিক থেকে মানুষ আসছে, ফিরে যাচ্ছে। হাতে ঝোলানো ব্যাগে সেই পরিচিত মাছ, সবজি-আনাজ।
এটি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামীণ হাট। ব্রিটিশ আমলের কোনো একসময় গ্রামে উৎপাদিত পণ্য কেনাবেচা করতেই এখানে হাটটি গড়ে উঠেছিল। আগের সেই জৌলুশ না থাকলেও প্রাচীন আভিজাত্য এখনো হাটের মেজাজে জড়িয়ে আছে।
নামের আড়ালে ১৫০ বছরের ইতিহাস
বাজারটি কবে স্থাপিত হয়েছে, সে বিষয়ে স্থানীয় কারোরই স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে প্রায় ১৫০ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে এ বাজারটির সূচনা—এ বিষয়ে সবাই একমত। একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই এলাকায় পুলিশের গারদ (পুলিশ ফাঁড়ি) স্থাপন করা হয়, যা স্থানীয়দের কাছে থানা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। সেই জায়গাতেই তখন ‘থানার বাজার’ শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলেই গারদটি এখান থেকে সরে গেছে। তবে থানা পরিচয়টি থেকে গেছে। ১৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এটি ‘থানার বাজার’ নামেই চলছে। শনিবার ও মঙ্গলবার বাদে সপ্তাহের বাকি পাঁচ দিন থানার বাজারে হাট বসে।
শুক্রবারের বিকেলটা তখন মেঘলা। সারা দিন মাঝেমধ্যেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি ঝরেছে। শেষবেলার রোদেরও দেখা নেই। এমন সময় থানার বাজারে গিয়ে দেখা যায়, হাটের সড়কটি ভেঙে গেছে। কয়েকটি গর্তে পানি জমে আছে। এই সড়ক ধরেই লোকজন চলাচল করছে। স্থায়ী-অস্থায়ী দোকান খুলে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। হাটে তখন ভিড় কম। সন্ধ্যার দিকে বেলা গড়িয়ে পড়লে ভিড় কিছুটা বাড়ে। হাটে স্থায়ী প্রায় ১০০ দোকান। সবজি, মাছ, পান-সুপারি, মসলাসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে আছে আরও অর্ধশতাধিক অস্থায়ী দোকান।
জমজমাট সেই দিনগুলো
স্থানীয় লোকজন জানান, একসময় হাটে আজকের মতো এত পাকা, টিনের ছাউনির দোকান ছিল না। কিছু কাঁচা দোকান ছাড়া বেশির ভাগই ছিল খোলা। ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো খোলা আকাশের নিচে দোকানে পণ্য সাজিয়ে বসতেন। বুদমতপুর, আব্দা, ভাদগাঁও, নওয়াগাঁও, কনকপুর, একাটুনা, পুদিনাপুর, নড়িয়াসহ আশপাশের ৮-১০ কিলোমিটার এলাকার মানুষ এই হাটে আসতেন। হবিগঞ্জের দিনারপুরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নৌকায় ধান নিয়ে আসতেন লোকজন। ভাটি অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে সেই ধান কিনতেন। স্থানীয় মাছের জন্যও বাজারটির আলাদা পরিচিতি ছিল। মাছ কিনতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসতেন। এখন দোকানের উন্নতি হয়েছে। কাঁচাঘর পাকা হয়েছে, খোলা জায়গায় টিনের ছাউনি হয়েছে। তবে প্রায় ৩০-৪০ বছর আগে থেকেই কমতে শুরু করে হাটের মানুষ।
লোকমুখে বেঁচে আছে পুরোনো দিনের গল্প
বাজার একসময় জমজমাট ছিল বলে জানান হাটের ক্রেতা পাশের আবদালপুর গ্রামের আকাম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘হাটর (হাটের) এক পাশ থাকি (থেকে) আরেক পাশে যাইতে বাক্কা (অনেক) সময় লাগত। কেউ হারলে আগেত মাইক আছিল না, চোঙা দিয়া ডাকা অইতো। সন্ধ্যার পরও অনেক মানুষ বাজারো আইতা। রাইত আট-নয়টায় মাছ, সবজি নিয়া আইতা অনেকে। রাইত ১১টা-১২টা পর্যন্ত বাজার চলতো। এখন আর আগর (আগের) অবস্থা নাই। মানুষ ছিতরি (ছড়িয়ে) গেছে। এখন ঘাটেঘাটে (স্থানে স্থানে) বাজার অইছে।’
‘২২ বছর ধরি সবজির ব্যবসা কররাম (করছি)।’ জানান সবজি বিক্রেতা আবুল কাশেম। তাঁর ভাষ্য, ‘এখন বাজার তেমন জমে না, তবু এই সবজি ব্যবসার লগেই আছি।’
সন্ধ্যা নামলেই জেগে ওঠে পুরোনো হাট
৩৮ বছর ধরে বাজারে মসলাপাতির ব্যবসা করেন বিনয় দেব। এখনো হাটবারে বিকেল হলেই খোলা জায়গায় পেঁয়াজ, মরিচ, ডালসহ বিভিন্ন পণ্য সজিয়ে বসেন। তিনি বলেন, ‘হাটের বয়স কওয়ার মতো মানুষ নাই। তবে ১৫০ বছরের ওপরে অইবো। মা-বাবায় কইছইন, আগে বাজার আরও পূবদিকে আছিল। ওখানো ইংলিশের (ব্রিটিশ) থানা আছিল। হাফ প্যান্ট পরি পুলিশ আইত। ব্রিটিশ আমলে থানা অইছে, ব্রিটিশ আমলেই থানা গেছেগি। অই থানার কাছেই বাজার শুরু অইছিল। এর লাগি বাজারর নাম থানার বাজার। অউ (এই) নামেই বাজার অখনো চলের।’
বিনয় দেবের কথা শুনতে শুনতে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাজারে মানুষও কিছুটা বেড়েছে। গ্রামের মানুষ আসছেন, কেনাকাটা করছেন। হাতে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটছেন। তখন প্রাচীন হাটটি যেন সেই পুরোনো চেহারাতেই আবার জেগে উঠেছে।