সিলেটে প্রচারের শেষ দিনে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটায় শেষ হচ্ছে। এর আগের দিন সোমবার দিনভর গণসংযোগের পাশাপাশি গণমিছিল, জনসভা করে ভোটারদের কাছে নানা পরিকল্পনার কথা বলেছেন প্রার্থীরা। তাঁদের মধ্যে ছিল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার প্রতিযোগিতা।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হবে।
সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসন
প্রচার শেষ হওয়ার আগের দিন সোমবার বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে গণমিছিল করেছেন বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। বেলা সাড়ে তিনটায় নগরের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে নগরের উপশহর এলাকায় এক সমাবেশ হয়। কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গণমিছিলের বিস্তৃতি ছিল। এ সময় স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয় চারপাশ। মিছিলটি নগরের চৌহাট্টা, জিন্দাবাজার, কোর্টপয়েন্ট, বন্দরবাজার, নাইওরপুল, সোবহানীঘাট হয়ে উপশহর এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। মিছিল চলাকালে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর হাত নেড়ে পথচলতি মানুষকে শুভেচ্ছা জানান এবং দোয়া চান।
মিছিল শেষে বক্তব্যে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, এই প্রচারণা মিছিল শুধু একটি কর্মসূচি নয়, এটি সিলেটবাসীর অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ের চূড়ান্ত বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকার মানুষ নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছেন। উন্নয়নের নামে হয়েছে লোকদেখানো কাজ, মানুষের কথা শোনার কেউ ছিল না।
প্রচার মিছিল–পরবর্তী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির নির্বাচিত সভাপতি নাসিম হোসাইন, জমিয়তের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আবদুল মালিক চৌধুরী প্রমুখ।
এদিকে সকালে নগরের লামাবাজার, তালতলা এলাকায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সমর্থনে গণসংযোগ করেন জামায়াতের প্রার্থী হাবিবুর রহমান। বাদ জোহর নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে আয়োজিত গণসংযোগে অংশ নেন। এ ছাড়া দুপুরে নগরে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত প্রচার মিছিলে নেতৃত্ব দেন।
প্রচার মিছিলটি নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকা থেকে শুরু হয়ে জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, দরগাগেট এলাকা ঘুরে আম্বরখানা এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে হাবিবুর রহমান প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘সিলেটবাসী সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি চায় না। তাঁরা তাঁদের পবিত্র আমানত দাঁড়িপাল্লার পক্ষে দিতে চায়। আমি নির্বাচিত হলে সিলেটকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও ভূমিদস্যুমুক্ত করব।’
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান বিকেলে রেজিস্টারি মাঠ থেকে নগরে ‘মার্চ ফর শরিয়া’ স্লোগানে গণমিছিল করেন। এতে আলেম-ওলামা, তরুণ, যুবক, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজন অংশ নেন। এ সময় মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নির্বাচিত হলে সিলেটবাসীর অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাব।’
এ ছাড়া বিকেলে নগরের চৌহাট্টা এলাকা থেকে সর্বশেষ নির্বাচনী প্রচারণা মিছিল বের করেন গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী আকমল হোসেন।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসন
সোমবার বিকেল সাড়ে চারটায় বিশ্বনাথ পৌরসভার নতুনবাজার এলাকায় নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর (লুনা)। বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আপনাদের একটি ভোট ইতিহাস বদলে দিতে পারে। ধানের শীষে একটি ভোট দেশকে বদলে দেবে। সবাই ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখে ভোট দেবেন, কারও ফাঁদে পা দেবেন না।’
বিএনপির ‘গুম’ হওয়া নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর বক্তব্যে আরও বলেন, ‘সিলেট-২ আসনের সকল সমস্যা আমরা চিহ্নিত করেছি। কোথায় উন্নয়ন প্রয়োজন, সেটা আমাদের জানা আছে। আমাকে নির্বাচিত করলে এসব পরিকল্পনা প্রথম বছরেই বাস্তবায়ন করা হবে।’
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসন
বিকেলে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ফেরিঘাট এলাকায় বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিকের সমর্থনে গণমিছিল ও সমাবেশ হয়। এতে প্রার্থী এম এ মালিক এবং জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেটের ছয়টি আসনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কাজের সমন্বয়ক আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী অতিথির বক্তব্য দেন।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বক্তব্যে বলেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে পাহারাদারের ভূমিকায় থাকতে হবে। সবাই গুপ্ত সংগঠনের সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকবেন। ভোটে যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বিএনপির জয় সুনিশ্চিত।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওহিদুজ্জামান ছুফি চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এস এম তাছলিম আহমদ নেহারের সঞ্চালনায় সভা হয়। এ সময় জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সাঈদ আহমদ, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কোহিনূর আহমেদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবদুল আহাদ খান জামাল প্রমুখ বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী মইনুল বাকর দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ, পথসভা ও প্রচারপত্র বিলি করেছেন।
সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসন
বিকেলে গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে গিয়ে মানুষের যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি, তারা যেভাবে আপন করে নিয়েছেন, তা অভূতপূর্ব। এখন কাজের মাধ্যমেই আমি তাঁদের ভালোবাসার প্রতিদান দেব।’
গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুব আলমের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিনের সঞ্চালনায় সভা হয়। এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী, সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ সিলেট জেলার সভাপতি মাওলানা আতাউর রহমান প্রমুখ।
আরিফুল হক চৌধুরী বক্তব্যে সিলেট-৪ আসনের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়া, প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, কৃষি যন্ত্রপাতি, বিশুদ্ধ খাবার পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে আমার প্রধান কাজ।’
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসন
বিকেলে গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদরের বাস টার্মিনাল এলাকায় বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরীর শেষ নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে দুপুর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে জনসভায় যোগ দেয়। সভায় বিএনপির প্রার্থী প্রধান অতিথির বক্তব্যে নির্বাচিত হলে তাঁর নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলার প্রতিটি ঘরে গ্যাস-সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় পরিকল্পিত উন্নয়ন চালানো হবে উল্লেখ করে এমরান আহমদ চৌধুরী বক্তব্যে বলেন, ‘আমি সুযোগ পেলে দুই উপজেলার মানুষের ভালোবাসার ঋণ রক্ত দিয়ে হলেও শোধ করতে চাই। প্রতীক বরাদ্দের পর সময় স্বল্পতার কারণে আমি অনেক এলাকায় যেতে পারিনি, আমি আপনাদের কাছে এ ব্যাপারে ক্ষমাপ্রার্থী। কথা দিচ্ছি, বিজয়ী হলে প্রথম এসব এলাকাতেই আমি যাব।’
গোলাপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি নোমান উদ্দিন মুরাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন। সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান উজ্জ্বলের সঞ্চালনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী (শামীম), সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু মিয়ার মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন, যুক্তরাজ্যও বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল কুদ্দুস শায়েস্তা প্রমুখ।
বিকেলে বিয়ানীবাজার পৌরসভার দক্ষিণ বিয়ানীবাজার এলাকায় জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের প্রার্থী বলেন, ‘গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারবাসীকে এত দিন কেন গ্যাস-সংযোগ দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, সেটা একটা প্রশ্ন। নির্বাচিত হলে সংসদের প্রথম অধিবেশনে গিয়েই এটা জানতে চাই।’
উপজেলা জামায়াতের আমির ফয়জুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশ হয়। সমাবেশ যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন উপজেলা জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মোহাম্মদ রুকন উদ্দিন, সিলেট মহানগর শিবিরের সাবেক সভাপতি ফরিদ আহমদ ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফরিদ আল মামুন।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার এই দুটি উপজেলা প্রবাসী অধ্যুষিত। প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ। কিন্তু এরপরও এই দুই উপজেলার সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে। আমাদের গ্যাস দিয়ে কলকারখানা চলে, অথচ এই অঞ্চলের মানুষ গ্যাস থেকে বঞ্চিত।’