সাঁথিয়া ও বেড়া
পানির অভাবে পাট জাগে খরচ বাড়ছে
প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ইছামতী নদীতে পাট পচানোর জন্য নিয়ে যেতে হচ্ছে।
এর ফলে প্রতি বিঘায় কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ছেঁচানিয়া গ্রামের কৃষক আবদুল আউয়াল প্রামাণিক এক বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করে চরম বিপাকে পড়েছেন। কারণ, খেতের পাট পচানো বা জাগ দেওয়ার মতো পানি আশপাশের দেড়-দুই কিলোমিটারের মধ্যে নেই। পাট পচানোর সময় পেরিয়ে যাওয়ায় খেতের পাট শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। বাধ্য হয়ে তিনি ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ইছামতী নদীতে পাট পচানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। এতে তাঁর প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।
আউয়াল প্রামাণিক বলেন, ‘প্রতিবছর পাট কাটার এই সময়ে জমির চারদিক জুইড়্যা কোথাও বুকসমান কোথাও সাঁতারপানি থাকে। কিন্তু এবার চারদিক একেবারে শুকনা। পুষ্ট হওয়ায় দুই সপ্তাহ আগেই পাট কাটা দরকার ছিল। কিন্তু বৃষ্টি আর পানির আশায় থাইক্যাও কুনু কাজ হলো না। তাই ম্যালা দূরে পাট পচানোর জন্য নিয়্যা যাত্যাছি। এতে বিঘায় শুধু পাঁচ হাজার টাকা বেশিই লাগতেছে না, চরম দুর্ভোগও সহ্য করা লাগত্যাছে।’
খেতের পাট পচানো বা জাগ দেওয়ার মতো পানি আশপাশের দেড়-দুই কিলোমিটারের মধ্যে নেই।
আউয়াল প্রামাণিকের মতো এবার পাট পচানো নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার পাটচাষিরা। পানির অভাবে জমি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নদী অথবা অন্য কোনো জলাশয়ে পাট পচানোর জন্য নিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁদের। এতে পাটের উৎপাদন খরচের সঙ্গে পরিবহন ভাড়া ও কামলা খরচ হিসেবে অতিরিক্ত পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা যুক্ত হচ্ছে।
পাটচাষিরা হিসাব করে জানান, পাট কেটে দূরের কোনো নদী বা জলাশয়ে নিতে প্রতি বিঘার জন্য ট্রলি অথবা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া লাগছে কমপক্ষে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা। এ ছাড়া দূরে নিয়ে সেখানে পচানোর জন্য জাগ তৈরিসহ পাট নিয়ে যাওয়া ও আনা বাবদ চারজন কামলা অতিরিক্ত লাগছে। দৈনিক ৭০০ টাকা হিসেবে ৪ জন কামলার মজুরিবাবদ অতিরিক্ত লাগছে ২ হাজার ৮০০ টাকা। এতে পরিবহন ভাড়া ও কামলা খরচ মিলিয়ে গচ্চা যাচ্ছে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা। পাটচাষিরা জানান, অন্য বছর বাড়ি বা জমির কাছে পাট পচানোর পর বাড়ির নারী-শিশুরা পাট ছাড়ানোতে অংশ নিয়েছে। কিন্তু এবার কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পাট পচানোয় সেখানে নারী-শিশুদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে পাট ছাড়ানো বাবদও অতিরিক্ত খরচ এবার গুনতে হচ্ছে।
এ দিকে পাটচাষি ও উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, খরার কারণে গত বছরের তুলনায় এবার পাটের ফলন ও মান কিছুটা খারাপ হয়েছে। এর আগে বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ ফলন পাওয়া গেলেও এবার পাওয়া যাচ্ছে আট মণের কাছাকাছি। এ ছাড়া পাটের আঁশের মানও আগের তুলনায় কিছুটা খারাপ হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবার সাঁথিয়া উপজেলায় ৭ হাজার ৮৪৫ হেক্টর ও বেড়া উপজেলায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। পেঁয়াজের আবাদ করতে গিয়ে দুই উপজেলার কৃষকেরা এবার বড় ধরনের লোকসান দিয়েছেন। কৃষকেরা আশা করেছিলেন, পাটের আবাদ করে সেই লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেবেন। কিন্তু পানির অভাবে প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাওয়ায় এবার পাটেও লোকসানের আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
কৃষকেরা জানান, বাজারে এখন ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হচ্ছে। দূরে পাট পচানোর জন্য নিয়ে যাওয়ার কারণে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা খরচ না হলে এমন দামে কৃষকদের প্রতি মণে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাভ হতো। কিন্তু অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা খরচের জন্য কোনোরকমে উৎপাদন খরচ উঠছে তাঁদের।
সরেজমিনে সাঁথিয়ার ইছামতী ও বেড়া পৌর এলাকার হুরাসাগর নদের পাড়ে দেখা যায়, দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা সেখানে পাট পচানোর নিয়ে আসছেন। ইছামতী নদীর পাড়ে পাট পচানোর জন্য নিয়ে আসা সাঁথিয়া উপজেলা ছেঁচানিয়া গ্রামের পাটচাষি দুলাল হোসেন বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে প্রায় এক হাজার পাটগাছের আঁটি হয়। এক আঁটি পাট কাটা থেকে শুরু করে ধোয়া, শুকানোবাবদ এবার ১২ টাকার মতো খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু এই বাবদই বিঘায় ১২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। পাটের বীজ, কীটনাশক, সারসহ বাকি খরচ ধরলে তো আরও ৮-৯ হাজার টাকা খরচ। এবার পাটের বাজার মোটুমটি ভালো ছিল। কিন্তু পানির অভাবে আমরা লাভের মুখ না দেইখ্যা লোকসানে পইড়্যা গেলাম।’