নির্বাচনী প্রচার তখন তুঙ্গে। বক্তব্যের একপর্যায়ে গ্রামবাসীকে প্রার্থী বললেন, ‘আপনাদের কোনো কথা আছে?’ এক নারী দাঁড়িয়ে পড়লেন। নিঃসংকোচে বললেন, ‘হামার নদীত ব্রিজ নাই, খুব কষ্ট হচে। ভোট আসিলেই তোমরা কহেন, ব্রিজখান করে দিমো, ভোট গেইলে আর হয় না।’ এ কথার জবাবে প্রার্থী বললেন, ‘সুযোগ পেলে এইবার ব্রিজটা ইনশা আল্লাহ করব।’
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর আর নারগুন ইউনিয়নকে বিভক্ত করেছে টাঙ্গন নদী। নদীর মাতৃগাঁও ঘাটে সেতু নেই। শুকনা মৌসুমে এখানে স্থানীয় লোকজন বাঁশের সাঁকো বানিয়ে চলাচল করেন। কিন্তু সাঁকোটি বেশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। সাঁকোর কোথাও কোথাও খুঁটি সরে গেছে। তবু এই ভাঙা সাঁকোই ১১টি গ্রামের মানুষের শুকনা মৌসুমে পারাপারের একমাত্র ভরসা। বর্ষায় নৌকা তাঁদের ভরসা। এতে ভোগান্তির শিকার হন এলাকার বাসিন্দারা। তবে বর্ষায় নৌকা চলাচলে সবচেয়ে ঝুঁকির শিকার হয় শিশু শিক্ষার্থীরা।
টাঙ্গন নদীপারের এলাকার লোকজন জানান, নদীর পশ্চিম পারে মাতৃগাঁও, মোহাম্মদপুর, রামপুর, শাহপাড়াসহ কয়েকটি গ্রাম আছে। মাতৃগাঁও উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শীবগঞ্জ হাট অবস্থিত। আর পূর্ব পারে নারগুন, বান্দিগড়, কার্তিকতলা, আমলাপাড়া, বোচাপুকুর, উত্তর বোচাপুকুর, লালাহাট গ্রাম। তাই পূর্ব পারের শিক্ষার্থী ও কৃষকদের নদী পার হয়ে বিদ্যালয় ও হাটে যেতে হয়। আবার পশ্চিম পারের লোকজন নদী পার হয়ে কৃষিকাজে যান। আগামী নির্বাচনে যিনি জয়ী হবেন, তাঁর কাছে চাওয়া তিনি যেন মাতৃগাঁও ঘাটের সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
মাতৃগাঁও গ্রামের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন (৫৯) বলেন, টাঙ্গন নদীর এই দিক দিয়ে না গিয়ে অন্য পথে নারগুন যেতে হলে ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। তাই তাঁরা ফসল নিয়ে এই দিক দিয়ে নদী পার হন। এতে তাঁর অনেক কষ্ট হয়। এলাকাবাসী এখানে একটা বাঁশের সাঁকো তৈরি করে চলাচল করছেন। এখানে একটা সেতু হলে তাঁদের দুর্ভোগ কমত।
একই গ্রামের হাসান উদ্দিন (৫৬) বললেন, ‘হামার বাপ-দাদা এই নদীত কষ্ট প্যায়া মরি গেইছে। মুই চেংরা বেলা থেকে শুনছু পুলখান হবে। মুইও বুড়া হয়ে গেনু। পুলখান মনে হয় দেখে যাবা পারিমোনি।’
কথা হয় বোচাপুকুর গ্রামের দিনমজুর সাইফুল ইসলামের (৬২) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হামার জীবনে আটবার-নয়বার এমপির ভোট দিছু। প্রতিবারই প্রার্থীরা এইঠে আসিয়া কহিছে, ভোটের পরে ব্রিজখান করে দিমো। কিন্তু ব্রিজখান অ্যালাও হইলনি। এইবার একখান সুযোগ আসিছে, নেতালাক কহিছো আগতে ব্রিজখান বানায় দেন, তারপর ভোট চাবা আইসেন।’
সাইফুলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই গ্রামের সাবেত্রী রানী (৬০) বলেন, ‘ভোট আসিলেই নেতারা দিন-রাইতে বাড়িত আসিয়া কহে, ভোট দেও, এবার ব্রিজ হয়া যাইবে। হামরাও তাতে পাগল হয়ে যাছি। হামরাতো বেশি কিছু চাওনি, একখান ব্রিজই চাহিছু।’
মোহাম্মদপুর গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী সোহরাব আলী (৫৯) বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে মাতৃগাঁও খেয়াঘাটে একটি সেতু না হওয়া আসলেই কষ্টের। প্রতিটি এমপি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এলেই প্রার্থীদের কাছ থেকে এখানে একটি সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতির কথা শোনেন তাঁরা। কিন্তু নির্বাচনের পর তাঁদের খোঁজ মেলে না।
গত ১ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে গণসংযোগে যান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে মাতৃগাঁও গ্রামের পাশের তোজামুলের চাতালে সভা করেন। সেখানে তাঁর কাছে টাঙ্গন নদীতে সেতু নির্মাণের দাবি করেন এলাকাবাসী। মির্জা ফখরুল এলাকাবাসীর কষ্ট লাঘবে সেতু নির্মাণের আশ্বাস দেন।
আশ্বাস শুনে ওই এলাকার বাসিন্দা শামসুল আলম (৬৪) বললেন, ‘এই জীবনে কত আশ্বাস পেলাম; কিন্তু সেতু পেলাম না। আলমগীর স্যারের এই আশ্বাসই যেন শেষ আশ্বাস হয়। সেতুটা পেলে এলাকাবাসী তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাস বলেন, ওই স্থানে সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।