মাথা-শুঁড়ে ক্ষত নিয়ে বনে গাছ টানছিল ‘সম্রাট’, ‘নিহারকলি’সহ আবার ফিরছে সাফারি পার্কে

ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত ‘সম্রাট’কে নলকূপ থেকে পানি পান করানো হচ্ছে। সোমবার দুপুরে মৌলভীবাজারে বন বিভাগের জুড়ী রেঞ্জ কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

মৌলভীবাজারের জুড়ীর লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের পাশে গাছ টানছিল হাতি ‘সম্রাট’। মাথা ও শুঁড়ে একাধিক ক্ষত নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসায় ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত ছিল সে। বন বিভাগের লোকজন তাকে উদ্ধার করে পানি ও কলাগাছ খেতে দেন। এবার আবার গাজীপুর সাফারি পার্কে নেওয়া হচ্ছে সম্রাটকে। সঙ্গে যাচ্ছে ‘নিহারকলি’ও। দুই বছর আগে উদ্ধার করা হাতি দুটিকে সম্প্রতি দেখভালকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আবার তাদের সাফারি পার্কে নেওয়া হচ্ছে।

বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বাসিন্দা মনির মিয়া হাতি সম্রাট এবং কমলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আবদুল মজিদ ‘নিহারকলি’ লালনপালন করতেন। আজ সোমবার তাঁদের অধীন থেকে হাতি দুটি ফেরত নিয়ে এসেছে বন বিভাগ। উদ্ধারের সময় সম্রাটের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত দেখা গেছে।

সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশনায় দুপুরের দিকে উপজেলার লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের কাছে সম্রাটকে পাওয়া যায়। সেখানে তাকে দিয়ে গাছ টানার কাজ করানো হচ্ছিল। এ সময় হাতিটির মাথা ও শুঁড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। হাতিটিকে রেঞ্জ কার্যালয়ে রাখা হয়েছে।
সাদ উদ্দিন আহমেদ, কর্মকর্তা, বন বিভাগের জুড়ীর রেঞ্জ
আরও পড়ুন

বন বিভাগের জুড়ীর রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশনায় দুপুরের দিকে উপজেলার লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের কাছে সম্রাটকে পাওয়া যায়। সেখানে তাকে দিয়ে গাছ টানার কাজ করানো হচ্ছিল। এ সময় হাতিটির মাথা ও শুঁড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। হাতিটিকে রেঞ্জ কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। সাত-আট কিলোমিটার পথ হেঁটে আসায় হাতিটি ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে। সে নলকূপ থেকে পর্যাপ্ত পানি পান করে। পরে তাকে কিছু কলাগাছ কেটে এনে খাওয়ানো হয়। গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানোর জন্য একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়েছে। সাফারি পার্কের লোকজন পৌঁছালে তাঁদের কাছে হাতিটি হস্তান্তর করা হবে।

সম্রাটের শরীরে ক্ষতচিহ্ন সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহুত (হাতি দেখভালকারী ব্যক্তি) আবদুর রউফ দাবি করেন, জঙ্গলে প্রবেশের সময় লেবুগাছের কাঁটা লেগে এ অবস্থা হয়েছে। তবে লাঠিটিলা বিটের কর্মকর্তা মো. সাজন বলেন, তিনি কয়েকবার দেখেছেন, হাতিকে দিয়ে কাজ করানোর সময় কথা না শুনলে লোহার ধারালো একধরনের বস্তু দিয়ে মাহুতরা শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করতে থাকেন। সম্রাটের শরীরেও এমন আঘাত করা হয়ে থাকতে পারে।

হাতি দুটি ফেরত আনতে প্রধানমন্ত্রী প্রধান বন সংরক্ষককে নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর প্রধান বন সংরক্ষকের নির্দেশনা পেয়ে তাদের ফেরত আনা হয়েছে। হাতি দুটিকে পুনরায় গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হবে।
মো. আবদুর রহমান, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, সিলেট

কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বন থেকে হাতি নিহারকলিকেও নিজেদের অধীন নিয়েছে বন বিভাগ। এ সময় ওই হাতির লালনপালনকারী ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আনারকলিকেও সম্রাটের সঙ্গে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হবে।

লালন-পালনকারীর কাছ থেকে ফেরত আনা হয়েছে হাতি নিহারকলিকে
ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আবদুর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, হাতি দুটি ফেরত আনতে প্রধানমন্ত্রী প্রধান বন সংরক্ষককে নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর প্রধান বন সংরক্ষকের নির্দেশনা পেয়ে তাদের ফেরত আনা হয়েছে। হাতি দুটিকে পুনরায় গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হবে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পোলসার গ্রামে হাতি সম্রাটের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে নজরুল ইসলাম নামের এক মাহুতের মৃত্যু হয়। কুড়িগ্রামের নজরুল ইসলাম ও পটুয়াখালীর হাসান নামের দুই ব্যক্তি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে হাতিটি দিয়ে টাকা তুলতেন। এ ঘটনার পর বন বিভাগ হাতিটিকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে পুনর্বাসনের জন্য গাজীপুর সাফারি পার্কে আনা হয়।

একই বছরের ৩১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকা থেকে হাতি নিহারকলিকে উদ্ধার করা হয়। সেখানে এক ব্যক্তি হাতিটি দিয়ে রাস্তায় মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতেন। এ ছাড়া হাতিটিকে লালনপালনকারীর লোকজন বেঁধে নির্যাতন করতেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল।

৬ ও ৭ আগস্ট গাজীপুর সাফারি পার্কে পরপর দুটি হাতির মৃত্যু হয়। এরপর পার্কে হাতির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় আটটিতে। ওই ঘটনার পরই সম্প্রতি সম্রাট ও নিহারকলিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আগে থেকেই সম্রাট ও নিহারকলিকে ফেরত নেওয়ার জন্য বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ করছিলেন লালনপালনকারীরা।

১৯ আগস্ট প্রথম আলো অনলাইনে ‘চাঁদা তোলা ও নির্যাতনের অভিযোগে উদ্ধার করা দুটি হাতি দেখভালকারীদের ফিরিয়ে দিল বন বিভাগ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

‘নিহারকলি’ নামের হাতিটিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধার করে গাজীপুর সাফারি পার্কের হাতিশালায় নিয়ে আসা হয়। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তোলা
ছবি: প্রথম আলো

হাতি দুটি ফিরিয়ে দেওয়া, আবার ফেরত নেওয়ার বিষয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন বন্য প্রাণিবিষয়ক সংগঠন ‘পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ সংগঠনের চেয়ারম্যান রাকিবুল হক। অনেক প্রশ্ন রেখে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, অমীমাংসিত অপরাধকে ক্ষমা করে লালনপালনকারীদের কাছে হাতি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার অনুমোদনে বা কিসের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল? হাতিগুলোকে গোপনে ফিরিয়ে দিয়ে আবার কি কারণে ফেরত আনা হচ্ছে? বন বিভাগের এ ভুল সিদ্ধান্তের দায় কার? এ ব্যাপারে বন বিভাগ কী ব্যবস্থা নিবে? সাফারি পার্কের অব্যবস্থাপনা ও শিকলবন্দী অবস্থায় এক দিনের ব্যবধানে দুটি হাতির মৃত্যু হয়। নিহারকলি ও সম্রাট দুই বছর শিকলবন্দী ছিল। তাদের কী আবারও শিকলবন্দী করা হবে? নাকি হাতিগুলোর সঠিক পুনর্বাসন নিয়ে বন বিভাগের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে?

আরও পড়ুন

এর আগে হাতি দুটিকে কোন শর্তে এবং কী প্রক্রিয়ায় লালনপালনকারীদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে, তা জানতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বন বিভাগের কাছে লিখিতভাবে তথ্য চাওয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে জানতে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি। এ ছাড়া বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল ঢাকার বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারীর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে দুবার তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর আর ফোন ধরেননি।