সাতক্ষীরার ৪ আসন
পুরোনো জোটের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা
জেলার চারটি আসনে প্রার্থী হতে মোট ২৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই–বাছাই ও আপিল শেষে বর্তমানে বৈধ প্রার্থী ২০ জন।
জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনের তিনটিতেই জামায়াতে ইসলামীকে ছাড় দিয়ে আসছিল বিএনপি। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়া এই দুই দলের মধ্যেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
জেলার চারটি আসনে প্রার্থী হতে মোট ২৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই–বাছাই ও আপিল শেষে বর্তমানে বৈধ প্রার্থী ২০ জন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা-১ আসনে পাঁচজন, সাতক্ষীরা-২ আসনে সাতজন, সাতক্ষীরা-৩ আসনে পাঁচজন ও সাতক্ষীরা-৩ আসনে তিনজন। সব আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু না হওয়ায় এখন প্রার্থীরা মূলত নানা সামাজিক কর্মসূচির আড়ালে ভোটের প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।
সীমান্তঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরায় জামায়াতে ইসলামীর শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিরোধ না থাকায় দলটি অনেক আগেই চারটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নামে। একই সময়ে বিএনপির মনোযোগ ছিল ইউনিয়ন কমিটি গঠনের পাশাপাশি দলীয় কোন্দল নিরসনে। বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর একাধিক আসনে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে নানা কর্মসূচিও হয়। কোথাও কোথাও সেই বিভেদ মিটলেও একটি আসনে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির এক নেতা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে জামায়াত ও একটিতে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) জয়ী হয়। ১৯৯৬ সালে জামায়াত সদর আসনে জয় পায়। বাকি চারটি যায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দখলে। ২০০১ সালে জামায়াত তিনটি আসনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনেই প্রথম সাতক্ষীরা-১ আসনে জয় পায় বিএনপি। ২০০৮ সালে আসনসংখ্যা কমে চারটি হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত একটি আসনও পায়নি।
এবার জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আজিজ বলেন, ‘কঠিন দিনগুলোতেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি আমরা। এবারও চারটি আসনেই বিজয়ী হব।’
অবশ্য জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদের মতে, ‘দীর্ঘ নির্যাতনের পরও আমাদের নেতা-কর্মীরা মানুষের পাশে ছিলেন। সব স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ভোট দিয়ে বিএনপিকে জয়ী করবে বলে আমার বিশ্বাস।’
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া)
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম (হাবিব)। তিনি দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকায় তাঁর একটি আলাদা ভোটব্যাংক রয়েছে বলে মনে করছেন অনেক ভোটার। জামায়াতের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ। ‘ব্যক্তি ইমেজের’ পাশাপাশি সাংগঠনিক অবস্থানের কারণে ইজ্জত উল্লাহর আলাদা ভোটব্যাংক রয়েছে বলে ধারণা অনেকের।
বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম বলেন, নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতেও সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নের পরিকল্পনা করবেন।
জামায়াতের প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ও তাঁর দল সাধারণ মানুষের পাশে ছিল। নির্বাচিত হলে স্থানীয় মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এলাকার উন্নয়নে উদ্যোগ নেবেন।
আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মোট সাতজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি বাকি তিন প্রার্থী হলেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব মো. ইয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় এনজিও বিষয়ক সম্পাদক জিয়াউর রহমান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাটকেলঘাটা থানা শাখার সভাপতি শেখ মো. রেজাউল করিম।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা)
জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. আবদুর রউফকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর আসনটিতে বিরোধ দেখা দেয়। মনোনয়ন না পেয়ে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলিম ও জেলা কমিটির বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক তাসকিন আহমেদের সমর্থকেরা আন্দোলনে নামেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কেউই প্রার্থী হননি।
আবদুর রউফ বলেন, সাধারণ ভোটাররা তাঁকে পছন্দ করেন, ভালোবাসেন। সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রশ্নে বিএনপির সবাই এখন এক। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষও এক হয়েছেন।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী দলের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের তাঁর ও তাঁর দলের ওপর আস্থা রয়েছে। বিগত নিরপেক্ষ নির্বাচনগুলোতে মানুষের আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে।
এ আসনে আরও প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় পার্টির জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির জেলার সাধারণ সম্পাদক জি এম সালাউদ্দীন, বাংলাদেশ জাসদের জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা শাখার উপদেষ্টা রবিউল ইসলাম ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) জেলা শাখার সদস্য শফিকুল ইসলাম (সাহেদ)।
সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি)
জেলার এই একটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর পাশাপাশি দলের এক নেতাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী আলাউদ্দীন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য শহিদুল আলম।
বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, শহিদুল আলম ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; যা জামায়াতের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবে।
যাচাই-বাছাইয়ে শহিদুল আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। পরে নির্বাচন কমিশনে আপিল করে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান। এ বিষয়ে শহিদুল আলম বলেন, ২-১৮ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর দলীয় মনোনয়নের জন্য এ আসনের দল-মত–ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই মাঠে নেমেছিলেন। বিএনপি থেকে তাঁকে মনোনয়ন না দেওয়ায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দাবির মুখে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন বলেন, দল তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্য কেউ প্রার্থী হতে চাইলে দল থেকে তাঁর প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, দুঃসময়ে তিনি ও দল সাধারণ ভোটারদের পাশে ছিল। তাঁরা তাঁকে ও দলকে মূল্যায়ন করবেন।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী দলের জেলা শাখার সাবেক আমির মুহা. রবিউল বাসার। জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ভোটাররা সৎ মানুষকে পছন্দ করেন ও আস্থা রাখেন।
এই আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সহসভাপতি মো. আলিফ হোসেন ও বাংলাদেশ মাইনরটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) সদস্য রুবেল হোসেন।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর)
যাচাই-বাছাই শেষে আসনটিতে তিনজন বৈধ প্রার্থী আছেন। তাঁরা হলেন জামায়াতের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা কর্মপরিষদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম, বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী এস এম মোস্তফা আল মামুন।
ভোটাররা বলছেন, বিগত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোতে সাতক্ষীরা-৪ আসনে বিএনপি তাদের শক্তিমত্তা দেখাতে পারেনি। নতুন মুখ হলেও প্রবাসী মনিরুজ্জামান প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। অপর দিকে জামায়াতের জি এম নজরুল ইসলাম দুবারের সংসদ সদস্য হওয়ায় তাঁর নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি পাঁচ বছর ধরে জনসাধারণের ভালো–মন্দে পাশে থাকার পাশাপাশি শ্যামনগর উন্নয়নে, বিশেষ করে তরুণসমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন।
জামায়াতের প্রার্থী জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ১৭ বছর ধরে নানা সমস্যার মধ্যে তাঁরা সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করবেন। ভোটারদের তাঁর প্রতি আস্থা রয়েছে।