চাকরি ছেড়ে ঘুরে ঘুরে কফি বেচেন স্নাতকোত্তর পাস আরিফ, মাসে লাভ ৩০ হাজার টাকা

স্নাতকোত্তর আরিফ হোসেন আপাতত কফি বিক্রিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সম্প্রতি রংপুর নগরের জিলা স্কুল চত্বর থেকে তোলাছবি: প্রথম আলো

রংপুর নগরের কাচারি বাজার এলাকায় সকাল হলেই বাড়তে থাকে নানা মানুষের ভিড়। অফিস-আদালতপাড়া হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় সেই ভিড়ের মাঝে চোখে পড়ে এক তরুণকে। মাথায় ক্যাপ, বুকে ঝোলানো লাল ব্যাগ, আর মুখে ছড়ানো হাসি। তিনি ঘুরেঘুরে কফি বিক্রি করছেন।

এই তরুণের নাম মোহাম্মদ আরিফ হোসেন। তবে তাঁকে সাধারণ কফি বিক্রেতা ভাবলে ভুল হবে। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তথাকথিত চাকরির পথে না হেঁটে নিজেই বেছে নিয়েছেন ভিন্ন এক পথ।

আরিফের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়। বাবা অটোচালক। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। সুন্দরগঞ্জ আবদুল মজিদ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ডি ডব্লিউ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য রংপুরে এসে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

৩১ মার্চ রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আরিফ হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। আরিফ জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি ২০১৮ সালে একটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের গাইবান্ধা কার্যালয়ে হিসাব ও প্রশাসন বিভাগে কাজ শুরু করেন। পরে ২০২৩ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং অফিসার হিসেবে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে যোগ দেন। ২০২৪ সালে রংপুরে ফিরে একটি গ্রাফিকস প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন।

এ সময় আরিফ স্ত্রী রুমান আখতার ও আড়াই বছরের ছেলে আবদুর রহমানকে নিয়ে জুম্মাপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাঁর স্ত্রীও অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।

অভাব থেকে নতুন পথ

বেসরকারি চাকরিতে আরিফের মাসিক বেতন ছিল ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। এ উপার্জনে সংসারের খরচ মেটাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। আরিফ বলেন, ‘মাস শেষে কোনো সঞ্চয় থাকত না। দিন আনা দিন খাওয়ার মতো অবস্থা ছিল।’

বিকল্প আয়ের খোঁজে আরিফ কিছুদিন ফুডপান্ডায় খণ্ডকালীন কাজ করেন। তবে তাতে সুবিধা হয়নি। একদিন ইউটিউবে চট্টগ্রামের এক ব্যক্তির কফি বিক্রির ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হন। পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে মাত্র ৫ হাজার ২০০ টাকায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কফি বিক্রি শুরু করেন।

প্রথম দিকে চাকরির পাশাপাশি বিকেলে কফি বিক্রি করতেন আরিফ। তিন মাসের মধ্যেই ভালো সাড়া পান। কাচারি বাজার, জেলা স্কুল মোড়, পৌর বাজার ও সুপার মার্কেট এলাকায় নিয়মিত কফি বিক্রি শুরু করেন আরিফ। সরকারি অফিসপাড়ার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তাঁর কফি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

গ্রাহকের চাহিদা ও আয়ের সম্ভাবনা দেখে ২০২৫ সালের মে মাসে চাকরি ছেড়ে দেন আরিফ। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৬ কেজি ওজনের সরঞ্জাম কাঁধে নিয়ে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা ও বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কফি বিক্রি করেন।

আরিফ জানান, বর্তমানে তাঁর দৈনিক বিক্রি ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা। মাসে বিক্রি হয় প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভ থাকে।

‘স্বাধীনতাই ভালো’

স্নাতকোত্তর পাস করে কফি বিক্রি—এ বিষয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফ বলেন, ‘আমি কাজটা উপভোগ করি। চাকরিতে অনেক বাধ্যবাধকতা থাকে, এখানে আমি স্বাধীন।’

শুরুতে কিছু নেতিবাচক কথা শুনলেও এখন অনেকেই কাজটির প্রশংসা করেন জানিয়ে আরিফ বলেন, ‘এখন আয় শুনে সবাই ভালোই বলে। প্রয়োজনে ডাকে, অনুষ্ঠানে যেতে পারি—চাকরির সময় সেটা পারতাম না।’

আরিফকে বেকার যুবকদের জন্য অনুকরণীয় বলে মনে করেন রংপুর আদালতের আইনজীবী ও ব্লাস্টের রংপুর ইউনিটের সমন্বয়কারী দিলরুবা রহমান। তিনি বলেন, ‘শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে বা হতাশ হয়ে বেকার না থেকে ছোট কিছু দিয়ে হলেও শুরু করা যায়—এ ক্ষেত্রে আরিফ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।’

আরিফ জানান, শুরু থেকেই তাঁর স্ত্রী তাঁকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একদিন নিজের একটা রেস্টুরেন্ট বা কফি শপ দিতে চাই।’ তাঁর মতে, মানুষ শুধু সাফল্য দেখে, পেছনের কষ্ট দেখে না। সৎ পথে যে কোনো কাজই সম্মানের।