সাড়ে ৬০০ বছরের এক ধুলামাখা পথ
দুই পাশে সবুজের সমারোহ। এরই মধ্যে লালচে আভার ইট বিছানো এক প্রশস্ত পথ। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ কোনো গ্রামীণ রাস্তা মনে হতে পারে, কিন্তু এই পথের প্রতিটি ইটের ভাঁজে লুকিয়ে আছে ৬৫০ বছরের পুরোনো ইতিহাস। বাগেরহাটে টিকে থাকা সড়কটি কেবল একটি পথ নয়, এটি দেশের প্রাচীনতম সড়ক ঐতিহ্যের এক অনন্যনিদর্শন এবং ইউনেসকো ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহ্যে’র অংশ।
চতুর্দশ শতাব্দীতে দক্ষিণবঙ্গের এই জনপদে ‘খলিফাতাবাদ’ নামে এক সমৃদ্ধ নগর গড়ে তুলেছিলেন হজরত খানজাহান (রহ.)। ঐতিহাসিকদের মতে, সড়কটি ছিল সেই নগরের মূল ‘ধমনি’। তৎকালীন শাসক ও ধর্মপ্রচারক খান-উল-আজম উলুঘ খান-ই-জাহান (যিনি খানজাহান আলী নামেই সমধিক পরিচিত) সুপরিকল্পিত নগরী গড়তে স্থাপত্যকলা ও প্রকৌশলবিদ্যার যে পরিচয় দিয়েছিলেন, এই সড়ক তারই সাক্ষী।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, খানজাহান সুপরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি ষাটগম্বুজসহ অসংখ্য মসজিদ, দিঘি (জলাধার), সেতু ও সড়ক নির্মাণ করে তাঁর প্রতিষ্ঠিত নগরীকে একটি বাসোপযোগী অঞ্চলে পরিণত করেছিলেন।
গবেষকদের ধারণা, পাকা সড়কটি কেবল যাতায়াতের জন্যই নয়; বরং প্রাচীন ভৈরব নদের আগ্রাসী থাবা থেকে খলিফাতাবাদ শহরকে রক্ষায় ‘রাস্তা কাম শহর রক্ষা বাঁধ’ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। ১৮১৪ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে এই সড়কের সম্ভাব্য রুটের বর্ণনা পাওয়া যায়।
সতীশচন্দ্র লিখেছেন, ‘রাস্তাটি ষাটগম্বুজ থেকে পূর্ব দিকে বাগেরহাট শহর অতিক্রম করে কাড়াপাড়া, বাসাবাটি গ্রামের মধ্য দিয়ে ভৈরবকূল অতিক্রম বৈটপুর, কচুয়া, চিংড়াখালী গ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে হোগলা বুনিয়ার নিকট বলেশ্বর পার হয়ে বরিশাল জেলায় প্রবেশ করে।’
কথিত আছে, খানজাহানের প্রাচীন রাস্তাটি যশোর থেকে বাগেরহাট হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সড়কের নিচে থাকা প্রাচীন ‘জলকপাট’ বা স্লুইস গেটের কারণে ঐতিহাসিকেরা ধারণা করেন যে এটি জলমগ্নতা থেকেও নগরকে সুরক্ষা দিত।
ষোড়শ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত বরিশাল থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত প্রাচীন রাস্তাটির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সড়কের টিকে থাকা অংশটি প্রায় ১৬ ফুট প্রশস্ত। খানজাহানের অন্যান্য স্থাপত্যের মতো এখানেও পাতলা ইট আড়াআড়িভাবে অত্যন্ত মজবুত করে সাজানো হয়েছে। যশোর ও বাগেরহাট অঞ্চলে সামরিক অভিযান এবং ধর্ম প্রচারের সুবিধার্থে এই স্থায়ী সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। যদিও ভূমিকম্প ও পদ্মা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এই দীর্ঘ সড়কের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
বাগেরহাট জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মো. যায়েদ জানান, দেশের একমাত্র প্রাচীন সড়ক নিদর্শন হিসেবে রাস্তাটি ২০১১ সালে সরকার সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে বাগেরহাট সদর উপজেলার মরগা গ্রামে খানজাহানের বসতভিটা থেকে ‘কাঁঠালতলা মোড়’ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশ টিকে অছে।
খানজাহানের রাস্তা নামে পরিচিত প্রাচীন সড়ক ঐতিহ্যটির অবস্থান ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ ষাটগম্বুজ মসজিদ ও সংলগ্ন খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের ৫০০ মিটারের মধ্যে।
২০১৪ সালে খননকাজ চলাকালে এই রাস্তার নিচে মিলেছে পনেরো শতকের কালভার্ট, নিরাপত্তাচৌকি এবং প্রাচীন প্রবেশদ্বারের ধ্বংসাবশেষ। তবে সড়কের একটি বড় অংশ এখনো আধুনিক পিচঢালা রাস্তার নিচে চাপা পড়ে আছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক গোলাম ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, সুলতানি আমলে হজরত খান জাহান (র.) দক্ষিণবঙ্গ (বাগেরহাট-খুলনা-যশোর অঞ্চল) জয় করার পর অসংখ্য ইটের রাস্তা নির্মাণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বাগেরহাট থেকে পূর্বে চট্টগ্রাম এবং পশ্চিমে যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত ইটের তৈরি পাকা সড়ক। এটি মূলত সামরিক ও ধর্মীয় প্রচারের কাজে ব্যবহৃত হতো।
এই সড়ক ঐতিহাসিক সংযোগ ও বাণিজ্যপথ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রাচীনকালে বাংলার অর্থনীতি মূলত নদীকেন্দ্রিক হলেও অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী সড়ক নেটওয়ার্ক কার্যকর ছিল বলে বিভিন্ন সড়ক ঐতিহ্য নির্দেশ করে।
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া রচিত বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ বইটিতে প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন সড়কের ভৌগোলিক অবস্থান ও ধ্বংসাবশেষের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে উল্লেখ, ষোড়শ শতকের পূর্ব পর্যন্ত বরিশাল থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত প্রাচীন রাস্তাটির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। তবে পরে প্রবল ভূমিকম্পে প্রমত্ত কীর্তিনাশা পদ্মার গতিপথ পরিবর্তিত হলে অনেক জনবসতির সঙ্গে প্রাচীন রাস্তাটিও একসময় নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
দেশের একমাত্র প্রাচীন সড়ক নিদর্শন হিসেবে রাস্তাটি ২০১১ সালে সরকার সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে বাগেরহাট সদর উপজেলার মরগা গ্রামে খানজাহানের বসতভিটা থেকে ‘কাঁঠালতলা মোড়’ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশ টিকে অছে।
খানজাহানের প্রাচীন রাস্তাটির অধিকাংশ নিদর্শনই হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে গোলাম ফেরদৌস বলেন, সুন্দরঘোনা বাজেয়াপ্তি থেকে কাঁঠালতলা পর্যন্ত টিকে থাকা সড়কটি ২০১৪ সালে দক্ষিণ এশিয়া পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশের একমাত্র সংরক্ষিত প্রাচীন সড়ক নিদর্শন হিসেবে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। প্রাচীন এই রাস্তা খননকালে মাটির নিচে থেকে বেরিয়ে আসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তুসহ প্রাচীন কালভার্ট, নিরাপত্তাচৌকি, প্রবেশদ্বার ও প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ।
কাঁঠালতলা পর্যন্ত রাস্তাটির একটি অংশ সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঁঠালতলা থেকে রণবিজয়পুরগামী ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন রাস্তার আরেকটি অংশ এখনো পাকা রাস্তার নিচে চাপা পড়ে আছে।